পবিত্র কুরবানী উনার পশুর বৈশিষ্ট্য

ইসলামী শরীয়ত উনাতে পবিত্র কুরবানী উনার জন্য নির্দিষ্ট কিছু পশুর কথা বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন- لِكُلّ اُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنسَكًا لّيَذْكُرُ‌وا اسْمَ اللهِ عَلـٰى مَا رَ‌زَقَهُم مّن بَـهِيْمَةِ الاَنْعَامِ ۗ‌ অর্থ :“আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য পবিত্র কুরবানী এই উদ্দেশ্যে নির্ধারিত করেছিলাম, যেনো তারা ওই নির্দিষ্ট গৃহপালিত পশুগুলির উপর (যবেহ করার সময়) মহান আল্লাহ পাক উনার নাম মুবারক উচ্চারণ করে যা তিনি তাদেরকে রিযিক হিসেবে দান করেছেন। (পবিত্র সূরা হজ্জশরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ৩৪) অর্থাৎ পবিত্র কুরবানী উনার পশু গৃহপালিত হতে হবে। আর গৃহপালিত পশুর মধ্যে কুরবানী যোগ্য পশুর বর্ণনা বিভিন্ন পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে। হযরত আনাস ইবনে মালিক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্র্ণিত। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি দু’টি সাদা-কালো বর্ণের বড়শিং বিশিষ্ট নর দুম্বা কুরবানী করেছেন। (বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ) অন্য হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে হযরত জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত- নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনিনিজ হাত মুবারক-এ তেষট্টিটি উট নহর করলেন।(মুসলিম শরীফ, আবূ দাউদ শরীফ) উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়িশা ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনার থেকে অন্য হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত আছে- وضحىرسولاللهصلىاللهعليهوسلمعننساءهبالبقر‌ অর্থ : “নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হযরত উম্মুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনাদের পক্ষ হতে গরু কুরবানী করেছেন।” (বুখারী শরীফ) “মুসলিম শরীফ” উনার মধ্যে হযরত জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকেও গরু কুরবানী উনার বিষয়টিবর্ণিত রয়েছে। অর্থাৎ কুরবানী যোগ্য পশু হচ্ছে দুম্বা, মেষ, ভেড়া, ছাগল, খাসী, উট, গরু, মহিষ।
বন্য পশু গরু হোক, মহিষ হোক তা দ্বারা কুরবানী করলে কুরবানী আদায় হবেনা। কারণ কুরবানী উনার জন্য গৃহপালিত পশু হওয়া শর্ত। উল্লেখ্য, পশুর নছব বা পরিচিতি হলো মায়ের দ্বারা। অর্থাৎ পশু গৃহপালিত বা জংলী তা চেনার জন্য সহজ পন্থা হলো- যে পশুর মা গৃহপালিত হবে, সে পশুটি গৃহপালিত বলে গণ্য হবে। আর যে পশুর মা জংলী হবে, সে পশুটি জংলী বলে গণ্য হবে। গৃহপালিত ছাড়া অন্যান্য পশু দ্বারা কুরবানী করা জায়িয হবেনা। তা হরিণ হোক অথবা বন্য গরু, ছাগল, বকরী, ভেড়া ইত্যাদি যাই হোক না কেন। (সমূহ্ ফিক্বাহ ও তাফসীরের কিতাব)
জাল্লালা প্রাণী দিয়ে কুরবানী করা জায়িয নেই। জাল্লালা প্রাণী বলে ওই প্রাণীকে, যে প্রাণী সদা-সর্বদা মল খেয়ে জীবন ধারণ করে, যার কারণে ঐ সমস্ত পশুর গোশতে দুর্গন্ধ পয়দা হয়। আর যে সমস্ত পশু প্রায় প্রায় মল বা নাজাসাত খেয়ে থাকে, সে সমস্ত পশু দিয়ে কুরবানী করা সম্পর্কে ইখতিয়ার রয়েছে। তবে যারা জায়িয বলেছেন, তারা বলেছেন- উট হলে ৪০ দিন, গরু হলে ২০ দিন, ছাগল হলে ১০ দিন, মোরগ হলে ৩ দিন, চড়ুই পাখি হলে ১ দিন বেঁধে রেখে ভাল খাদ্য দিয়ে তার গোশতের দুর্গন্ধ দূরীভূত করে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার পর যবেহ করা জায়িয ও তা দ্বারা কুরবানী আদায় করা জায়িয। (সমূহ ফিক্বাহের কিতাব)

হযরত বারা ইবনে আযিব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি পবিত্র কুরবানী উনার পশু সম্পর্কে বর্ণনা করেন- اشار رسول الله صلى الله عليه وسلم بيده ويدي قصر من يده اربع لا يضحى بـهن العوراء البين عورها والـمريضة البين مرضها والعرجاء البين ظلعها والعجفاء التي لا تنقي فقالوا للبراء فانـما نكره النقص في السن والاذن والذنب قال فاكرهوا ما شئتم ولا تـحرموا على الناس. অর্থ : “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হাত মুবারক দিয়েইশারা মুবারক করেন- আমার হাত মুবারক তো উনার হাত মুবারক থেকে ছোট এবং বলেন, ‘চার ধরণের পশু দ্বারা কুরবানী করা যায়না- ১) যে পশুর চোখের দৃষ্টিহীনতা সুস্পষ্ট, ২) যে পশু অতি রুগ্ন, ৩) যে পশু সম্পূর্ণ খোড়া এবং ৪) যে পশু এত জীর্ণ-শীর্ণ যে তার হাড়ে মগজ নেই।’ হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা বললেন, আমরা তো দাঁত, কান ও লেজে ত্রুটিযুক্ত প্রাণী দ্বারাওকুরবানী করা অপছন্দ করি। তিনি বললেন, যা ইচ্ছা অপছন্দ করতে পারেন তবে তা অন্যের জন্য হারাম করবেন না।” (ইবনে হিব্বান শরীফ : ৫৯১৯, আবূ দাউদ শরীফ, নাসায়ী শরীফ, তিরমিযী শরীফ) হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার থেকে বর্ণিত- امرنا رسول الله صلى الله عليه وسلم ان نستشرف العين والاذن وان لا نضحي بـمقابلة ولا مدابرة ولا شرقاء ولا خرقاء.‌ অর্থ : “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি আমাদের আদেশ মুবারক করেন, আমরা যেন পবিত্র কুরবানী উনার পশুর চোখ ও কান ভালোভাবে লক্ষ করি এবং ওই পশু দ্বারা কুরবানী না করি, যার কানের অগ্রভাগ বা পশ্চাদভাগ কর্তিত। তদ্রুপ যে পশুর কান ফাড়া বা কান গোলাকার ছিদ্রযুক্ত।” (আবূ দাউদ শরীফ, নাসায়ী শরীফ, তিরমিযী শরীফ, ইবনে মাজাহ শরীফ) হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার থেকে আরো বর্ণিত আছে- نـهى رسول الله صلى الله عليه وسلم ان يضحى باعضب القرن والاذن. অর্থ : “নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনি আমাদের শিংভাঙ্গা বা কান-কাটা পশু দ্বারা পবিত্র কুরবানী করতে নিষেধ করেছেন।” (ইবনে মাজাহ শরীফ)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ও ফিক্বাহ্র কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে, কোন প্রাণীর কোন এক অঙ্গ যেমন- কান, লেজ ইত্যাদির এক তৃতীয়াংশের বেশী নষ্ট হয়ে গেলে তা দ্বারাকুরবানী করা জায়িয নেই। কোন কোন ক্ষেত্রে যেমন দাঁত অর্ধেকের বেশী যদি থাকে, তাহলে তা দিয়ে কুরবানী করা দুরুস্ত রয়েছে। এ উছূলের উপর ক্বিয়াস করে কোন কোন আলিম নামধারী মূর্খ ও গুমরাহ লোকেরা বলে থাকে যে, খাসী ও বলদ ইত্যাদি প্রাণী দ্বারা কুরবানী করলে নাকি কুরবানী দুরুস্ত হবেনা। অথচ এ ধরণের ক্বিয়াস অশুদ্ধ, নাজায়িয এবং পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার বিরোধী। কেননা স্বয়ং মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি নিজে খাসীকুরবানী করেছেন। যা পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে উল্লেখ রয়েছে- عن حضرت جابر رضى الله تعالى عنه قال ذبح النبى صلى الله عليه وسلم يوم الذبح كبشين أقرنين املحين موجوئين. অর্থ :“হযরত জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি এক কুরবানীউনার দিন সাদা-কালো মিশ্রিত রঙ্গের শিং বিশিষ্ট খাসীকৃত দু’টি তাজা দুম্বা কুরবানী করলেন।” কাজেই, এ পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয়, খাসী এবং খাসীকৃত প্রাণী কুরবানী করা জায়িয তো বটেই বরং খাস সুন্নত উনার অন্তর্ভূক্ত। খাসী করার কারণে প্রাণীর মধ্যে ছূরতান (প্রকাশ্য) যে ত্রুটি বা খুত হয়, সেটা শরয়ী ত্রুটি বা খুঁতের অন্তর্ভুক্ত নয়।

ইসলামী শরীয়ত উনাতেপবিত্র কুরবানী উনার জন্য শুধু পশুই নির্দিষ্ট করে দেয়নি সাথে সাথে তার বয়সও নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে হযরত জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার থেকে বর্ণনা করেন- لا تذبـحوا الا مسنة، الا ان يعسر عليكم فتذبـحوا جذعة من الضأن. অর্থ : “আপনারা মুছিন্না ব্যতীত কুরবানী (যবেহ) করবেন না, তবে সংকটের অবস্থায় ছয় মাস বয়সী ভেড়া-দুম্বা যবেহ করতে পারেন।”(মুসলিম শরীফ) মুছিন্না (مسنة) শব্দের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, উট ৫ বছর হলে, গরু, মহিষ ২ বছর হলে আর খাসী-বকরী, ভেড়া, দুম্বা ইত্যাদি ১ বছর হলে মুছিন্নার হুকুম বর্তায় অর্থাৎ পবিত্র কুরবানী উনার উপযুক্ত হয়। এর কম বয়সের পশুকে কুরবানী করলে কুরবানী হবেনা। তবে শুধুমাত্র ভেড়া ও দুম্বার বেলায় বলা হয়েছে, যদি ৬ মাসের দুম্বা বা ভেড়াকে দেখতে ১ বছরের মত মনে হয় তবে সে দুম্বা বা ভেড়া দিয়ে কুরবানী করলে কুরবানী শুদ্ধ হবে।(কুদূরী, হিদায়া)