পবিত্র কুরবানী কাকে বলে?

বা পবিত্র কুরবানী শব্দটি একবচন। বহুবচনে এর আভিধানিক অর্থ কুরবানী, উৎসর্গ, পবিত্র কুরবানী উনার পশু ঈদুল আদ্বহার দিন যা যবেহ করা হয়। শরীয়ত উনার পরিভাষায় খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহ পাক উনার নামে নির্দিষ্ট তারিখে নির্দিষ্ট নিয়মে নির্দিষ্ট প্রাণী যবেহ করার নাম পবিত্র কুরবানী। অর্থাৎ পবিত্র যিলহজ্জ শরীফ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখের যে কোন দিনে দুম্বা, মেষ, ভেড়া, খাসী, ছাগল, উট, গরু, মহিষ প্রভৃতি গৃহপালিত হালাল চতুষ্পদ প্রাণীসমূহকে মহান আল্লাহ পাক উনার পবিত্র নাম মুবারক উচ্চারণ করে উনার সন্তুষ্টি মুবারক লাভের উদ্দেশ্যে যবেহ করাকে পবিত্র কুরবানী বলে।

পবিত্র কুরবানী উনার বিধান সম্পর্কে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন- . .অর্থ :হে আমার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! নিশ্চয়ই আমি আপনাকে কাওছার বা বহু কল্যাণ হাদিয়া করেছি। অতএব, (এর শুকরিয়া স্বরূপ) আপনি নামায পড়ন এবং কুরবানী করুন।(পবিত্র সূরা কাওছারশরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ১, ) উল্লেখ্য, পবিত্র কুরবানী উনার বিধান শুধু আমাদের জন্যেই দেয়া হয়েছে তা নয় বরং পূর্ববর্তী উম্মতের প্রতিও উনার বিধান প্রবর্তিত ছিল। যেমন মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন- ٰ ۗঅর্থ :আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য পবিত্র কুরবানী উনার বিধান দিয়েছি, যাতে তারা গৃহপালিত পশুর উপরে মহান আল্লাহ তায়ালাউনার নাম মুবারক স্মরণ করে। অর্থাৎ মহান আল্লাহ তায়ালাউনার সন্তুষ্টি ও নির্দেশ মুতাবিক উনার নামে পশু কুরবানী করে।(পবিত্র সূরা হজ্জ শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ৩৪)

কুরবানী উনার ইতিহাস

আল্লাহ পাক নূরে মুজাসসাম,হাবীবুল্লাহ,হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে বলেন,- আপনি আপনার রব তায়ালা উনার উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুণ ও কুরবানী করুন। (সূরা কাওসার : )

সামর্থ্যবান মুসলমানদের জন্য কুরবানী করা ওয়াজিব।আমরা ধারাবাহিকভাবে কুরবানীর ইতিহাস,ফযিলত, মাসয়ালা,মাসায়েল সহ আরো বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জানবো ইনশাআল্লাহ৷

পৃথিবীর সর্বপ্রথম কুরবানী:

কুরবানীর ইতিহাস খুবই প্রাচীন।আদি পিতা হযরত আদম সফিউল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার যুগ থেকেই কুরবানীর বিধান চলে আসছে। হযরত আদম সফিউল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার দুই ছেলে হযরত হাবীল আলাইহিস সালাম ও কাবীলের কুরবানী পেশ করার কথা আমরা আল-কুরআন উল কারীম থেকে জানতে পারি।
মহান আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন,
﴿ ۞ٱۡ ۡۡ ٱۡۡ ٱۡ ۡ ۡٗ ۡ ۡ ۡ ٱۡٓ ۡۖ ٱ ٱۡ ٢٧ [: ٢٧
অর্থাৎ, হযরত আদম সফিউল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার দুই পুত্রের (হযরত হাবিল আলাইহিস সালাম ও কাবিলের) বৃত্তান্ত আপনি তাদেরকে যথাযথভাবে শুনিয়ে দিন, যখন তারা উভয়ে কুরবানী করেছিল, তখন একজনের কুরবানী কবুল হলো এবং অন্যজনের কুরবানী কবুল হলো না। তাদের একজন বলল, আমি আপনাকে অবশ্যই হত্যা করবঅপরজন বলল, আল্লাহ তো সংযমীদের কুরবানীই কবূল করে থাকেন।[সূরা মায়িদা ():২৭]

মূল ঘটনা হলো:

যখন হযরত আদম সফিউল্লাহ আলাইহিস সালাম হযরত হাওওয়া আলাইহাস সালাম উনারা পৃথিবীতে আগমন করেন এবং উনাদের বংশ বিস্তার আরম্ভ হয়, তখন হাওয়া আলাইহাস সালাম উনার প্রতি গর্ভ থেকে জোড়া জোড়া (জময) অর্থাৎ একসাথে একটি পুত্র ও একটি কন্যা এরূপ জময সন্তান জন্মগ্রহণ করত। কেবল হযরত শীশ আলাইহিস সালাম ব্যতিরেকে। কারণ, তিনি একা তাশরীফ নিয়েছিলেন। তখন হযরত আদম সফিউল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার পরিবারই এই ধরার বুকে প্রথম পরিবার।আর কোন পরিবার ছিলো না।

তাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা উপস্থিত প্রয়োজনের খাতিরে হযরত আদম সফিউল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার শরীয়তে বিশেষভাবে এ নির্দেশ জারি করেন যে, একই গর্ভ থেকে যে যমজ পুত্র ও কন্যা জন্মগ্রহণ করবে, তারা পরস্পর সহোদর ভাই-বোন হিসেবে গণ্য হবে। তাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম। কিন্তু পরবর্তী গর্ভ থেকে জন্মগ্রহনকারী পুত্রের জন্য প্রথম গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণকারীনি কন্যা সহোদরা বোন হিসেবে গণ্য হবে না। তাদের মধ্যে পরস্পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া বৈধ। সুতরাং সে সময় হযরত আদম সফিউল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার একটি জোড়ার মেয়ের সাথে অন্য জোড়ার ছেলের বিয়ে দিতেন।

ঘটনাক্রমে কাবীলের সাথে যে সহোদরা জন্ম নিয়েছিলেন তিনি ছিল পরমা সুন্দরী। উনার নাম ছিল হযরত আকলিমা আলাইহাস সালাম। কিন্তু হযরত হাবিল আলাইহিস সালাম উনার সাথে যে সহোদরা জন্ম নিয়েছিলেন তিনি দেখতে অতটা সুন্দরী ছিল না। উনার নাম ছিল লিওযা। বিবাহের সময় হলে শরয়ী নিয়মানুযায়ী হযরত হাবিল আলাইহিস সালাম উনার সহোদরা বোন কাবীলের ভাগে পড়ল।কিন্তু কাবীল উনাকে না বিয়ে করে নিজের সহোদরা হযরত আকলিমা আলাইহাস সালাম উনাকে বিয়ে করতে চাইল। ফলে হযরত আদম সফিউল্লাহ আলাইহিস সালাম তৎকালীন শরীয়তের আইনের পরিপ্রেক্ষি তে কাবীলের আবদার প্রত্যাখ্যান করলেন এবং তাকে উনার নির্দেশ মানতে বললেন। কিন্তু সে মানল না। এবার তিনি তাকে শাসন করলেন। তবুও সে ঐ শাসনে কান দিল না। অবশেষে হযরত আদম সফিউল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার দুসস্তান হযরত হাবীল আলাইহিস সালাম ও কাবীলের মতভেদ দূর করার উদ্দেশ্যে বললেন, তোমরা উভয়ে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কুরবানী পেশ কর, যার কুরবানী গৃহীত হবে, তার সাথেই আকলিমা উনার বিয়ে দেয়া হবে।

সে সময় কুরবানী গৃহীত হওয়ার একটি সুস্পষ্ট নিদর্শন ছিল যে, আকাশ থেকে একটি অগ্নিশিখা এসে সে কুরবানীকে ভষ্মীভূত করে ফেলত। আর যার কুরবানী কবূল হতো না তারটা পড়ে থকত। যাহোক, তাদের কুরবানীর পদ্ধতি সম্পর্কে যা জানা যায় তা হলো- কাবীল ছিল চাষী। তাই সে গমের শীষ থেকে ভাল ভাল মালগুলো বের করে নিয়ে বাজে মালগুলোর একটি আটি কুরবানীর জন্য পেশ করল। আর হযরত হাবীল আলাইহিস সালাম ছিল পশুপালনকারী। তাই তিনি উনার জন্তুর মধ্যে থেকে সবচেয়ে সেরা একটি দুম্বা কুরবানীর জন্য পেশ করল। এরপর নিয়মানুযায়ী আকাশ থেকে অগ্নিশিখা এসে হযরত হাবীল আলাইহিস সালাম উনার কুরবানীটি ভষ্মীভুত করে দিল। [ফতহুল ক্বাদীরের বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, হযরত হাবীল আলাইহিস সালাম উনার পেশকৃত দুম্বাটি জান্নাতে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং তা জান্নাতে বিচরণ করতে থাকে। অবশেষে হযরত ইসমাঈল যবিহুল্লাহ উনার সম্মানার্থে ঐ দুম্বাটি পাঠিয়ে দেয়া হয়।]

আর কাবীলের কুরবানী যথাস্থানেই পড়ে থাকল। অর্থাৎ হযরত হাবীল আলাইহিস সালাম উনার কুরবানী গৃহীত হলো আর কাবীলেরটি হলো না। কিন্তু কাবীল এ আসমানী সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারল না। এ অকৃতকার্যতায় কাবীলের দুঃখ ও ক্ষোভ আরো বেড়ে গেল। সে আত্মসংবরণ করতে পারল না এবং প্রকাশ্যে তার ভাইকে বলল, আমি অবশ্যই আপনাকে হত্যা করব। হযরত হাবীল আলাইহিস সালাম তখন ক্রোধের জবাবে ক্রোধ প্রদর্শন না করে একটি মার্জিত ও নীতিগত বাক্য উচ্চারণ করল, এতে কাবীলের প্রতি উনার সহানুভূতি ও শুভেচ্ছা ফুটে উঠেছিল।
হযরত হাবীল আলাইহিস সালাম বলেছিলেন, তিনি মুত্তাক্বীর কর্মই গ্রহণ করেন। সুতরাং তুমি তাক্বওয়ার কর্মই গ্রহণ করো। তুমি তাক্বওয়া অবলম্বন করলে তোমার কুরবানীও গৃহীত হতো। তুমি তা করোনি, তাই তোমার কুরবানী প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এতে আমার দোষ কোথায়?.....তবুও এক পর্যায়ে কাবীল হযরত হাবীল আলাইহিস সালাম উনাকে শহীদ করে ফেলল। (তাফসীর ইবনে কাসীর, দুররে মনসূর, ফতহুল বায়ান, /৪৫ ও ফতহুল ক্বাদীর, /২৮-২৯)

আল্লাহ পাক নূরে মুজাসসাম,হাবীবুল্লাহ,হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে বলেন,- আপনি আপনার রব তায়ালা উনার উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুণ ও কুরবানী করুন। (সূরা কাওসার : )

সামর্থ্যবান মুসলমানদের জন্য কুরবানী করা ওয়াজিব।আমরা ধারাবাহিকভাবে কুরবানীর ইতিহাস,ফযিলত, মাসয়ালা,মাসায়েল সহ আরো বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জানবো ইনশাআল্লাহ৷

আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿ ٖ ۡ ٗ ۡ ٱۡ ٱ ٰ ۢ ٱٰۡۡۗ ٰۡ ٰٞ ٰٞ ۥٓ ۡۗ ٱۡۡ ٣٤ [: ٣٤]
অর্থাৎ প্রত্যেক উম্মতের জন্য আমি কুরবানীর বিধান রেখেছিলাম, যাতে তারা উক্ত পশু যবেহ করার সময় আল্লাহপাক উনার নাম স্মরণ করে এ জন্য যে, তিনি চতুষ্পদ জন্তু থেকে তাদের জন্য রিযিক নির্ধারণ করেছেন। [সূরা হাজ্জ (২২):৩৪]

মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে যত শরীয়ত নাযিল হয়েছে, প্রত্যেক শরীয়তের মধ্যে কুরবানী করার বিধান জারি ছিল। প্রত্যেক উম্মতের ইবাদতের এ ছিল একটা অপরিহার্য অংশ।

বর্তমান কুরবানীর ইতিহাস :
পবিএ কুরআন শরীফ উনাতে এসেছে-
﴿ ۡ ٱٰ ١٠٠ ٰۡ ٰ ٖ ١٠١ ٱۡ ٰ ٓ ٰ ٱۡ ٓ ۡ ٱۡ ٰۚ ٰٓ ٱۡۡ ۡۖ ٓ ٱ ٱٰ ١٠٢ ۡ ۥ ۡ ١٠٣ ٰٰۡ ٰٰٓۡ ١٠٤ ۡ ۡ ٱۡۚ ٰ ۡ ٱۡۡ ١٠٥ ٰ ٱٰۡٓ ٱۡ ١٠٦ ٰۡ ۡ ٖ ١٠٧ ۡ ۡ ٱۡٓ ١٠٨ ٰ ٰٓ ٰۡ ١٠٩ ٰ ۡ ٱۡۡ ١١٠ ۥ ۡ ٱۡۡ ١١١ [: ١٠٠ ١١١]

অর্থঃ হযরত ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম যখন আমার কাছে দুআ করল, হে আমার রব! আপনি আমাকে এক সৎকর্মশীল পুত্র সন্তান দান করুন। অতঃপর আমি উনাকে এক অতি ধৈর্যশীল পুত্র উনার সুসংবাদ দিলাম। অতঃপর তিনি যখন উনার পিতার সাথে চলাফিরা করার বয়সে পৌঁছল, তখন হযরত ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম বললেন, হে আমার সম্মানিত আওলাদ আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি আপনাকে যবেহ করছি, এখন বলুন, আপনার অভিমত কী? হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম বললেন, হে সম্মানিত পিতা আলাইহিস সালাম ! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তাই করুন, আল্লাহ চাইলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীলই পাবেন। দুজনেই যখন আনুগত্যে মাথা নুইয়ে দিল আর হযরত ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনাকে কাত করে শুইয়ে দিল। তখন আমি হযরত ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনাকে ডাক দিলাম, হে হযরত ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম! স্বপ্নে দেয়া আদেশ আপনি সত্যে পরিণত করেই ছাড়লেন। এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি। অবশ্যই এটা ছিল একটি সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি এক মহান কুরবাণীর বিনিময়ে হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম উনাকে ছাড়িয়ে নিলাম। আর আমি উনাকে পরবর্তীদের মাঝে স্মরণীয় করে রাখলাম। হযরত ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক! সৎকর্মশীলদেরকে আমি এভাবেই প্রতিদান দিয়ে থাকি।তিনি ছিলেন আমার মুমিন বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত। [সূরা আস- সাফফাত শরীফঃআয়াত শরীফ ১০০-১১১]

ইবনে কাসীর রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আল্লাহ তাআলা আমাদের জানান যে, উনার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হযরত ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম যখন উনার পিতৃভুমি থেকে হিজরত করলেন, তখন তিনি উনার প্রভুর কাছে চেয়েছিলেন যে, তিনি যেন তাকে সৎকর্মশীল সন্তান দান করেন। তাই আল্লাহ তাআলা উনাকে একজন ধৈর্যশীল পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। এটা ছিল হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম উনার ব্যাপারে, কেননা তিনি ছিলেন হযরত ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার ঔরসে জন্ম নেয়া প্রথম সন্তান। এ ব্যাপারে বিভিন্ন দ্বীনের (ইহুদী, খ্রিস্টান ও মুসলিম) অনুসারীদের মধ্যে কোন মতভেদ নেই যে হযরত ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার ঘরে হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম প্রথম জন্মগ্রহণ করেছিলেন। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, /১৫৭-১৫৮)

ٱۡ অর্থাৎ এবং যখন তিনি উনার সাথে হাটার মত বড় হলো- এর অর্থ হচ্ছে, যখন তিনি বড় হয়েছিলেন এবং হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার মতই নিজেই নিজের দেখাশোনা করতে পারতেন। মুজাহিদ রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, এবং যখন তিনি উনার সাথে হাটার মত বড় হলোএর অর্থ হচ্ছে, যখন তিনি বড় হয়ে উঠেছিলেন এবং বাহনে চড়তে পারতেন, হাঁটতে পারতেন এবং উনার বাবার মত কাজ করতে পারতেন।ইবনু আববাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, ঐ সময় তিনি কেবল সাবলকত্বে উপনীত হয়েছিলেন। (তাফসীর কুরতুবী, ১৫/৯৯)

এ রকম একটা অবস্থা যখন আসল, তখন হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম স্বপ্নে দেখলেন যে, উনাকে হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম উনাকে কুরবানী করার আদেশ দেয়া হচ্ছে।হযরত নবী আলাইহিমুস সালাম উনাদের স্বপ্ন হচ্ছে ওহী মুবারক।উনাদের তাদের চক্ষু মুদিত থাকলেও অন্তরচক্ষু খোলা থাকে।

সুতরাং আল্লাহ পাক হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনাকে উনার প্রিয়পুত্রকে কুরবানী করার আদেশ দিয়ে পরীক্ষা করছিলেন, যে পুত্রকে তিনি উনার বৃদ্ধাবস্থায় পেয়েছিলেন এবং তারপর শিশু অবস্থায় উনাকে এবং উনার সম্মানিতা মাতা হযরত হাজেরা আলাইহাস সালাম উনাকে মরুভুমিতে রেখে আসার আদেশ পেয়েছিলেন, এমন একটা উপত্যকায় যেখানে কোন জনপ্রাণীর সাড়াশব্দ ছিল না, কোন মানুষজন ছিল না, কোন বৃক্ষরাজি ছিল না এবং কোন পাখ-পাখালী বা পশুও ছিল না। হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম আল্লাহ পাক উনার আদেশ পালন করলেন এবং আল্লাহ পাক উনার উপর ভরসা করে উনাদেরকে সেখানে রেখে আসলেন। আর আল্লাহ পাক উনাদের জন্য অপ্রত্যাশিত উৎস থেকে রিযিক পাঠালেন।

এত কিছুর পরেও, হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার ঘরে প্রথম জন্ম নেয়া ও উনার একমাত্র পুত্র উনাকে কুরবানী করার জন্য যখন আদেশ করা হলো, তিনি তখন আল্লাহ পাক উনার ডাকে সাড়া দিলেন এবং আল্লাহ পাক উনার আদেশ মেনে, তিনি যা চেয়েছিলেন, তা করতে উদ্যত হলেন।

তাই তিনি হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম উনাকে ব্যাপারটা সম্বন্ধে বললেন,হে আমার সম্মানিত আওলাদ আলাইহিস সালাম আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি আপনাকে জবাই করছি (আমি আপনাকে আল্লাহ পাক উনার জন্য কুরবানী করছি)তাহলে, আপনি কী বলেন এই বিষয়ে! হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম সাথে সাথেই জবাব দিলেন, হে আমার সম্মানিত আব্বাজান আলাইহিস সালাম! আপনাকে যে আদেশ করা হয়েছে, আপনি তা-ই করুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন।

আল্লাহ পাক বলেন, ۡ ۥ ۡ তারপর উনারা উভয়ে নিজেদেরকে ( আল্লাহ পাক উনার ইচ্ছার কাছে) সমর্পণ করলেন, এবং তিনি উনাকে উনার পার্শ্বে উপর কাত অবস্থায় শুইয়ে দিলেন এখানে বলা হয়েছে, যখন উনারা উভয়ে নিজেদেরকে সমর্পণ করলেন- অর্থ হচ্ছে উনারা দুজনে যখন নিজেদেরকে আল্লাহ পাক উনার আদেশের কাছে সমর্পণ করলেনএবং তিনি উনাকে শুইয়ে দিলেন উনারা উভয়ে নিজেদের সমর্পণ করলেন।

হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম বললেন, আল্লাহু আকবার , হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম বললেন, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহতাফসীরের কিতাবে এসেছে, হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম যখন হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম উনার গলদেশে ছুরি চালান, কিন্তু তা উনাকে কাটেনি। এটা বলা হয়ে থাকে যে, ছুরি উনার গলার মাঝখানে একটা তামার পাত রাখা হয়েছিল।

আল্লাহ পাক বলেন,

﴿ ۡ ۡ ٱۡۚ ١٠٥ [: ١٠٥]

হে হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম! আপনি আপনার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেছেন!-
এর অর্থ হচ্ছে উদ্দেশ্য সাধিত হয়েছে, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে আর আপনি তা যথাযথ পালন করেছেন।

তাই আল্লাহ পাক বলেন,

﴿ ٰ ٱٰۡٓ ٱۡ ١٠٦ [: ١٠٦]
অর্থঃনিশ্চয় এটা ছিল স্পষ্ট পরীক্ষা।
অর্থাৎ এটা যে একটা পরীক্ষা ছিল তা পুরোপুরি স্পষ্ট। নিঃসন্দেহে এখানে মূল উদ্দেশ্য যবেহ ছিল না, বরং উদ্দেশ্য ছিল পিতা-পুত্রের আনুগত্য ও তাক্বওয়ার পরীক্ষা নেওয়া। সে পরীক্ষায় উভয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন পিতার পূর্ণ প্রস্ত্ততি এবং পুত্রের স্বতঃস্ফুর্ত সম্মতি ও আনুগত্যের মাধ্যমে।

আল্লাহ পাক বলেন,
﴿ ٰۡ ۡ ٖ ١٠٧ [: ١٠٧]
অর্থঃআমি এক মহান কুরবাণীর বিনিময়ে হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম উনাকে ছাড়িয়ে নিলাম।

এরপর জান্নাত থেকে আল্লাহ পাক একটা দুম্বা পাঠিয়ে দেন ।সেটাই কুরবানী করা হয় ।সুবহানাল্লাহ

পবিত্র কুরআন শরীফ উনার আলোকে পবিত্র কুরবানী

কুরবানী শব্দের অর্থ হচ্ছে- মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি মুবারক হাছিলের উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহ পাক উনার পবিত্র নাম মুবারকে নির্দিষ্ট তারিখে নির্দিষ্ট নিয়মে নির্দিষ্ট পশু যবেহ করা অর্থাৎ পবিত্র যিলহজ্জ শরীফ মাস উনার ১০, ১১, ১২ তারিখের মধ্যে উট, মহিষ, গরু, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা এসব হালাল গৃহপালিত চতুষ্পদ পশুকে মহান আল্লাহ পাক উনার নাম মুবারকে উনারই সন্তুষ্টি মুবারক হাছিলের লক্ষ্যে যবেহ করা পবিত্র কুরবানী উনার মূলে উদ্বহিয়্যাহ শব্দ মুবারক এসেছে যার অর্থ হচ্ছে- মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি মুবারক লাভের উদ্দেশ্যে যবেহকৃত পশু পবিত্র কুরবানী সম্পর্কে মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র সূরা হজ্জ শরীফ উনার ২৮নং পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন- অর্থ:- এবং তারা যেন স্মরণ করে কতক নির্দিষ্ট দিনে মহান আল্লাহ পাক উনার পবিত্র নাম মুবারক গৃহপালিত চতুস্পদ পশুর উপরে (অর্থাৎ কুরবানী করে সে সকল পশু) যা মহান আল্লাহ পাক তাঁদেরকে রিযিক হিসেবে দিয়েছেন আর তা থেকে তোমরা খাও এবং গরীব মিসকিনদেরকে খাওয়াও মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র সূরা হজ্জ শরীফ উনার ৩৬নং পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন- অর্থ:- পবিত্র কুরবানী উনার উটসমূহ অর্থাৎ পশুসমূহকে আমি মহান আল্লাহ পাক উনার শিয়া বা নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত করেছি আর এর মধ্যে রয়েছে তোমাদের জন্য অফুরন্ত কল্যাণ সুতরাং তোমরা উনাদের উপর মহান আল্লাহ পাক উনার পবিত্র নাম মুবারক স্মরণ করো দাঁড় করিয়ে অতঃপর উটগুলো যখন কাত হয়ে (যমীনে) পড়বে তখন তোমরা উহার কিছু অংশ খাবে এবং অযাঞ্চাকারী, যাঞ্চাকারী সকল অভাবীকেও খাওয়াবে এরূপে আমি উহাদিগকে অর্থাৎ পশুগুলোকে তোমাদের আওতাধীন করে দিয়েছি যাতে তোমরা শুকরিয়া করতে পারো মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র কুরবানী সম্পর্কে পবিত্র সূরা আল কাওছার শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন- অর্থাৎ- নিশ্চয়ই আমি আপনাকে কাওছার হাদিয়া করেছি অতএব, আপনার মহান রব উনার সন্তুষ্টি মুবারক লাভের উদ্দেশ্যে পবিত্র নামায আদায় করুন এবং পবিত্র কুরবানী করুন মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র সূরা হজ্জ শরীফ উনার ৩৪নং পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন- অর্থ:- আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্যই পবিত্র কুরবানী উনার বিধান দিয়েছিলাম যাতে তাঁরা মহান আল্লাহ পাক উনার নাম মুবারক স্মরণ করে গৃহপালিত চতুস্পদ পশুর উপরে অর্থাৎ পবিত্র কুরবানী করে মহান আল্লাহ পাক তিনি প্রথমোক্ত দুইখানা পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মাধ্যমে পবিত্র মুক্কা শরীফ- উপস্থিত হাজী ছাহেবদের পবিত্র কুরবানী করার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন আর শেষক্তো দুইখানা পবিত্র আয়াত শরীফ উনাদের মাধ্যমে প্রত্যেক সামর্থবান মুসলমানকে তাদের স্ব-স্ব স্থানে পবিত্র কুরবানী করার নির্দেশ মুবারক দিয়েছেন উপরুন্ত এটা জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, পবিত্র কুরবানী উনার বিধান শুধু আমাদের জন্যই নয় বরং পূর্ববর্তী উম্মতদের জন্যও ছিলো

পবিত্র কুরআন শরীফ এবং পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে পবিত্র কুরবানী

খলিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

অর্থ: হে আমার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি আপনাকে কাওছার বা বহু কল্যাণ হাদিয়া করেছি। অতএব, আপনি আপনার প্রতিপালকের জন্য নামায পড়ন এবং কুরবানী করুন।

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

অর্থ: পবিত্র ঈদুল আদ্বহা উনার দিন কুরবানীর পশুর রক্ত প্রবাহিত করা অর্থাৎ পশু যবেহ করা সর্বশ্রেষ্ঠ আমল। সুবহানাল্লাহ!

ালিক মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

অর্থ: পবিত্র কুরবানীর পশুর গোশ্ত ও রক্ত কোনোকিছুই মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট পৌঁছে না। শুধু তাক্বাওয়াই পৌঁছে থাকে। সুবহানাল্লাহ!

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবাক হয়েছে, পবিত্র ঈদুল আদ্বহা উনার দিনে কুরবানীর পশুর রক্ত গোশ্ত মাটিতে পড়ার পূর্বেই মহান আল্লাহ পাক তিনি বান্দার গুনাহখাতা মাফ করে দেন। সুবহানাল্লাহ!

মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাদের সকলকে পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ মুতাবিক কুরবানী করার তাওফীক দান করুন। আমীন!

কুরবানী যোগ্য পশু

ইসলামী শরীয়ত উনাতে পবিত্র কুরবানী উনার জন্য নির্দিষ্ট কিছু পশুর কথা বর্ণনা করা হয়েছে যেমন সম্পর্কে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন- ٰ ۗ অর্থ :আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য পবিত্র কুরবানী এই উদ্দেশ্যে নির্ধারিত করেছিলাম, যেনো তারা ওই নির্দিষ্ট গৃহপালিত পশুগুলির উপর (যবেহ করার সময়) মহান আল্লাহ পাক উনার নাম মুবারক উচ্চারণ করে যা তিনি তাদেরকে রিযিক হিসেবে দান করেছেন (পবিত্র সূরা হজ্জশরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ৩৪) অর্থাৎ পবিত্র কুরবানী উনার পশু গৃহপালিত হতে হবে আর গৃহপালিত পশুর মধ্যে কুরবানী যোগ্য পশুর বর্ণনা বিভিন্ন পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে হযরত আনাস ইবনে মালিক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্র্ণিত নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি দুটি সাদা-কালো বর্ণের বড়শিং বিশিষ্ট নর দুম্বা কুরবানী করেছেন (বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ) অন্য হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে হযরত জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত- নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনিনিজ হাত মুবারক- তেষট্টিটি উট নহর করলেন(মুসলিম শরীফ, আবূ দাউদ শরীফ) উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়িশা ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনার থেকে অন্য হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত আছে- অর্থ : নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হযরত উম্মুল মুমিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনাদের পক্ষ হতে গরু কুরবানী করেছেন (বুখারী শরীফ) মুসলিম শরীফ উনার মধ্যে হযরত জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকেও গরু কুরবানী উনার বিষয়টিবর্ণিত রয়েছে অর্থাৎ কুরবানী যোগ্য পশু হচ্ছে দুম্বা, মেষ, ভেড়া, ছাগল, খাসী, উট, গরু, মহিষ

পবিত্র কুরবানী উনার পশুর শরয়ী ত্রুটি

হযরত বারা ইবনে আযিব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি পবিত্র কুরবানী উনার পশু সম্পর্কে বর্ণনা করেন- . অর্থ : সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হাত মুবারক দিয়েইশারা মুবারক করেন- আমার হাত মুবারক তো উনার হাত মুবারক থেকে ছোট এবং বলেন, চার ধরণের পশু দ্বারা কুরবানী করা যায়না- ) যে পশুর চোখের দৃষ্টিহীনতা সুস্পষ্ট, ) যে পশু অতি রুগ্ন, ) যে পশু সম্পূর্ণ খোড়া এবং ) যে পশু এত জীর্ণ-শীর্ণ যে তার হাড়ে মগজ নেই হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা বললেন, আমরা তো দাঁত, কান লেজে ত্রুটিযুক্ত প্রাণী দ্বারাওকুরবানী করা অপছন্দ করি তিনি বললেন, যা ইচ্ছা অপছন্দ করতে পারেন তবে তা অন্যের জন্য হারাম করবেন না (ইবনে হিব্বান শরীফ : ৫৯১৯, আবূ দাউদ শরীফ, নাসায়ী শরীফ, তিরমিযী শরীফ) হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার থেকে বর্ণিত- . অর্থ : সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি আমাদের আদেশ মুবারক করেন, আমরা যেন পবিত্র কুরবানী উনার পশুর চোখ কান ভালোভাবে লক্ষ করি এবং ওই পশু দ্বারা কুরবানী না করি, যার কানের অগ্রভাগ বা পশ্চাদভাগ কর্তিত তদ্রুপ যে পশুর কান ফাড়া বা কান গোলাকার ছিদ্রযুক্ত (আবূ দাউদ শরীফ, নাসায়ী শরীফ, তিরমিযী শরীফ, ইবনে মাজাহ শরীফ) হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার থেকে আরো বর্ণিত আছে- . অর্থ : নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনি আমাদের শিংভাঙ্গা বা কান-কাটা পশু দ্বারা পবিত্র কুরবানী করতে নিষেধ করেছেন (ইবনে মাজাহ শরীফ)

আইইয়ামে নহর বাপবিত্র কুরবানী উনার দিনে পবিত্র কুরবানী উনার পশু ব্যতীত অন্যান্য প্রাণী যবেহ করার বিধান

উনাদের আইয়ামে নহর বা পবিত্র কুরবানী উনারদিনে মজূসী বা অগ্নি উপাসকরা তাদের ধর্মীয় বিধান মুতাবিক হাঁস-মুরগি ইত্যাদি যবেহ করে থাকে। এখন যদি কোন মুসলমান তাদের সাথে মুশাবাহ বা সাদৃশ্য রেখে কুরবানী উনার দিন হাঁস-মুরগি ইত্যাদি যবেহ করে, তাহলে সেটা কুফরী হবে। কারণ মহান আল্লাহ পাকউনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন- ٰ . অর্থ : হযরত আব্দুল্লাহ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ইবনেহযরত উমর ফারূক্ব আলাইহিস সালাম উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে মিল রাখে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। (আবূ দাঊদ শরীফ)
আর যদি কোন মুসলমান সাধারণভাবে উক্ত সময়ে হাঁস-মুরগি ইত্যাদি যবেহ করে, তাহলে সেটা মাকরূহ তাহরীমী হবে, যেহেতু এটাও মুশাবাহ হয়ে যায়।

আর যদি কোন মুসলমান খুব জরুরতে হাঁস-মুরগি ইত্যাদি যবেহ করে, তাহলে সেটাও মাকরূহ তানযীহী হবে। আর এমন কোন মুসলমান, যার উপর কুরবানী ওয়াজিব অথবা ওয়াজিব নয়, তারা যদি পবিত্র কুরবানী উনার দিন হাঁস, মুরগি ইত্যাদি খেতে চায়, তাহলে তারা যেনো ছুবহি ছাদিকের পূর্বেই সেটা যবেহ করে কেটে রান্না করে রেখে দেয় অথবা শুধু যবেহ করে কেটে রেখে দিবে পরে রান্না করলেও চলবে। (শামী, আলমগীরী, ফতহুল ক্বাদীর, শরহে হিদায়া)

বন্য পশু তথা বন্য গরু-মহিষের দ্বারা কুরবানী দেয়া নাজায়িয

বন্য পশু গরু হোক, মহিষ হোক তা দ্বারা কুরবানী করলে কুরবানী আদায় হবেনা। কারণ কুরবানী উনার জন্য গৃহপালিত পশু হওয়া শর্ত। উল্লেখ্য, পশুর নছব বা পরিচিতি হলো মায়ের দ্বারা। অর্থাৎ পশু গৃহপালিত বা জংলী তা চেনার জন্য সহজ পন্থা হলো- যে পশুর মা গৃহপালিত হবে, সে পশুটি গৃহপালিত বলে গণ্য হবে। আর যে পশুর মা জংলী হবে, সে পশুটি জংলী বলে গণ্য হবে। গৃহপালিত ছাড়া অন্যান্য পশু দ্বারা কুরবানী করা জায়িয হবেনা। তা হরিণ হোক অথবা বন্য গরু, ছাগল, বকরী, ভেড়া ইত্যাদি যাই হোক না কেন। (সমূহ্ ফিক্বাহ ও তাফসীরের কিতাব)

 

খাসী, বলদ ইত্যাদি দ্বারা পবিত্র কুরবানী করা দুরস্ত ও শরীয়তসম্মত তো অবশ্যই বরং খাছ সুন্নত উনার অন্তর্ভুক্ত

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ও ফিক্বাহ্র কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে, কোন প্রাণীর কোন এক অঙ্গ যেমন- কান, লেজ ইত্যাদির এক তৃতীয়াংশের বেশী নষ্ট হয়ে গেলে তা দ্বারাকুরবানী করা জায়িয নেই। কোন কোন ক্ষেত্রে যেমন দাঁত অর্ধেকের বেশী যদি থাকে, তাহলে তা দিয়ে কুরবানী করা দুরুস্ত রয়েছে। এ উছূলের উপর ক্বিয়াস করে কোন কোন আলিম নামধারী মূর্খ ও গুমরাহ লোকেরা বলে থাকে যে, খাসী ও বলদ ইত্যাদি প্রাণী দ্বারা কুরবানী করলে নাকি কুরবানী দুরুস্ত হবেনা। অথচ এ ধরণের ক্বিয়াস অশুদ্ধ, নাজায়িয এবং পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার বিরোধী। কেননা স্বয়ং মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি নিজে খাসীকুরবানী করেছেন। যা পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে উল্লেখ রয়েছে- . অর্থ :হযরত জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি এক কুরবানীউনার দিন সাদা-কালো মিশ্রিত রঙ্গের শিং বিশিষ্ট খাসীকৃত দুটি তাজা দুম্বা কুরবানী করলেন। কাজেই, এ পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয়, খাসী এবং খাসীকৃত প্রাণী কুরবানী করা জায়িয তো বটেই বরং খাস সুন্নত উনার অন্তর্ভূক্ত। খাসী করার কারণে প্রাণীর মধ্যে ছূরতান (প্রকাশ্য) যে ত্রুটি বা খুত হয়, সেটা শরয়ী ত্রুটি বা খুঁতের অন্তর্ভুক্ত নয়।

১০

জাল্লালা প্রাণী দ্বারা কুরবানী করা নাজায়িয

জাল্লালা প্রাণী দিয়ে কুরবানী করা জায়িয নেই জাল্লালা প্রাণী বলে ওই প্রাণীকে, যে প্রাণী সদা-সর্বদা মল খেয়ে জীবন ধারণ করে, যার কারণে সমস্ত পশুর গোশতে দুর্গন্ধ পয়দা হয় আর যে সমস্ত পশু প্রায় প্রায় মল বা নাজাসাত খেয়ে থাকে, সে সমস্ত পশু দিয়ে কুরবানী করা সম্পর্কে ইখতিয়ার রয়েছে তবে যারা জায়িয বলেছেন, তারা বলেছেন- উট হলে ৪০ দিন, গরু হলে ২০ দিন, ছাগল হলে ১০ দিন, মোরগ হলে দিন, চড়ুই পাখি হলে দিন বেঁধে রেখে ভাল খাদ্য দিয়ে তার গোশতের দুর্গন্ধ দূরীভূত করে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার পর যবেহ করা জায়িয তা দ্বারা কুরবানী আদায় করা জায়িয (সমূহ ফিক্বাহের কিতাব)

১১

কুরবানীদাতার ফাযায়িল-ফযীলত

() পবিত্র কুরবানী উনার ফযীলত সম্পর্কে বহু পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে। যেমন পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে- . অর্থ :হযরত যায়িদ ইবনে আরকাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমউনারা জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! এই কুরবানী কি?তিনি জাওয়াবে বললেন, তোমাদের পিতা হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার সুন্নত। উনারা পূনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! এতে আমাদের জন্য কি পরিমাণ নেকী রয়েছে?তিনি বললেন, পবিত্র কুরবানী উনার পশুর প্রতিটি পশমের পরিবর্তে একটি করে নেকী রয়েছে। হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা আবার জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! পশমওয়ালা পশুর ক্ষেত্রে কি হুকুম? তিনি বললেন, পশমওয়ালা পশুর প্রত্যেকটি পশমের পরিবর্তেও একটি করে নেকী রয়েছে। সুবহানাল্লাহ! (মুসনাদে আহমদ শরীফ, ইবনে মাজাহ শরীফ, মিশকাত শরীফ)

() বর্ণিত রয়েছে, নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম তিনি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার দরবার শরীফ-এ প্রার্থনা জানান, বারে ইলাহী! আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উম্মত উনারাপবিত্র কুরবানী করলে কি পরিমাণ ছওয়াব পাবে? মহানআল্লাহ তায়ালা তিনি জবাব দেন, পবিত্র কুরবানী উনার পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে কুরবানীদাতা দশটি নেকী লাভ করবে, তার দশটি গুণাহ ক্ষমা করা হবে এবং দশটি মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেয়া হবে। সুবহানাল্লাহ!হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম তিনি পুনরায় জিজ্ঞাসা করেন, পবিত্র কুরবানী উনার পশুর পেট চিরলে কি পরিমাণ ছওয়াব পাবে? মহানআল্লাহ তায়ালা তিনি বলেন, কুরবানীদাতা কবর হতে উঠলে ক্ষুধা-পিপাসায় অস্থির হবে না এবং ক্বিয়ামতের ভয়ভীতি থেকেও ইতমিনান থাকবে। সুবহানাল্লাহ! আরো বলেন, পবিত্র কুরবানী উনার পশুর প্রতি গোশতের টুকরারবদলে কুরবানীদাতা জান্নাতে একেকটি মহল লাভ করবে। সুবহানাল্লাহ! মহানআল্লাহ তায়ালা তিনি আরো বলেন, হে হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম! আপনি জেনে রাখুন, কুরবানীদাতার জন্য পবিত্র কুরবানী উনার পশু (পুলছিরাত পার হওয়ার) বাহন স্বরূপ হবে।

() বর্ণিত রয়েছে, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র মদীনা শরীফ দশ বছর অবস্থান মুবারক করেছেন। প্রতি বছরই পবিত্র কুরবানী করেছেন; কখনও তা ছাড়েননি এবং হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারাও পবিত্র কুরবানী করার ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। পবিত্র কুরবানী না করে তার অর্থ দান করে দেয়ার বিধান শরীয়ত উনার মধ্যে নেই। কেননা, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি কিংবা হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারাও এরূপ করেননি। অথচ উনাদের যুগেই এর জরুরত ছিল অধিক। বরং উনারা পবিত্র কুরবানী করেছেন এবং তার গোশত ও চামড়া অভাবগ্রস্থদের মধ্যে বণ্টন করতে বলেছেন। পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন- .অর্থ : উম্মুল মুমিনীন হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনার থেকে বর্ণিত। মহান আল্লাহ পাকউনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, বান্দা-বান্দী বা উম্মত পবিত্র কুরবানী উনার দিন যেসব নেকীর কাজ করে থাকেন তন্মধ্যে মহান আল্লাহ পাকউনার নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় আমল হলো পবিত্র কুরবানী করা। ক্বিয়ামত দিবসে পবিত্র কুরবানী উনার পশু তার শিং, পশম ও খুরসহ উপস্থিত হবে এবং পবিত্র কুরবানী উনার পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার পূর্বেই তা মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট পৌঁছে যায়। (সুবহানাল্লাহ!) কাজেই তোমরা আনন্দচিত্তে পবিত্র কুরবানী করো। (তিরমিযী শরীফ ও ইবনে মাজাহ শরীফ)এক বর্ণনা মতে, পবিত্র কুরবানী উনার পশু কুরবানীদাতার নাজাতের ব্যাপারে সাক্ষ্য দান করবে। পবিত্র কুরবানী উনার পশুর প্রতিটি পশমের পরিবর্তে মহান আল্লাহ পাক তিনি কুরবানীদাতার আমলনামায় অসংখ্য নেকী দান করেন। সুবহানাল্লাহ!

() পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, মহান আল্লাহ পাকউনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, পবিত্র ঈদুল আদ্বহা উনার দিনে বান্দার পবিত্র কুরবানী উনার পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার পূর্বেই মহান আল্লাহ পাক তার সমস্ত গুণাহ মাফ করে দেন।সুবহানাল্লাহ!

() পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে, যে সমস্ত পশু দ্বারা পবিত্র কুরবানী করা হবে ক্বিয়ামতের দিন সেই পশুগুলো কুরবানীদাতাকে পিঠে করে বিদ্যুৎবেগে পুলছিরাত পার করে বেহেশতে পৌঁছিয়ে দিবে। সুবহানাল্লাহ!

() পবিত্রহাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে, পবিত্র কুরবানী উনার পশু ক্বিয়ামতের দিন সাওয়ারী বা বাহন হিসেবে গণ্য হবে।
সুতরাং কানা, খোড়া, রোগাক্রান্ত, কানকাটা, দন্তহীন ইত্যাদি যাবতীয় দোষযুক্ত পশু পবিত্র কুরবানী করা পরিহার করতঃ সম্পূর্ণ দোষমুক্ত পশু দ্বারা পবিত্র কুরবানী করা উচিত। উল্লেখ্য, যাদের উপর পবিত্র কুরবানী ওয়াজিব তারা তো পবিত্র কুরবানী করে অফুরন্ত ফযীলত লাভ করবেন। কিন্তু যাদের উপর পবিত্র কুরবানী ওয়াজিব নয় তারাও ইচ্ছা করলে একাধিকজন মিলে মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুবারক নামে দুম্বা, মেষ, ভেড়া, ছাগল, খামী বা গরু, মহিষ পবিত্র কুরবানী দিয়ে পবিত্র কুরবানী উনার ফযীলত লাভ করতে পারে।

১২

পবিত্র কুরবানীর বরকতময় রক্ত আরো বেশি প্রবাহিত হোক

পবিত্র কুরবানীর ঈদের দিন বৃষ্টির পানির সাথে কুরবানীর পশুর রক্ত প্রবাহিত হয়েছিলো শহরের অলিতে গলিতে, বিভিন্ন রাস্তায় কিছু কুরবানীবিরোধী মিডিয়া কথিত পরিবেশবাদী এসব রাস্তার ছবি নিয়ে খুব হায় হুতাশ করেছে ছবিগুলো সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে দেশ-বিদেশে ছড়িয়েছে পক্ষে বিপক্ষে অনেক মন্তব্য হয়েছে, আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে অনেক মুসলমান এসবের জবাব দিতে না পেরে বলেছে রাস্তার রক্তমিশ্রিত ছবিগুলো ফটোশপে লাল করা হয়েছে অতিরঞ্জিত করার জন্য হয়তো ফটোশপে এডিট হতেও পারে কিন্তু সেটা আমার বলার বিষয় নয় আমি মনে করি রাস্তা রঞ্জিত হয়েছে আরো রঞ্জিত হওয়া উচিত কুরবানীর রক্ত সবজায়গাতেই প্রবাহিত হওয়া উচিত কেননা পবিত্র কুরবানীর ইবাদতটিই রক্ত প্রবাহের কুরবানীর দিনকে বলা হয় ইয়াওমুন নহর নহর শব্দটির অর্থ হচ্ছে রক্ত প্রবাহিত করা অর্থাৎ মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য মুসলমানগণ পশু কুরবানী করে রক্ত প্রবাহিত করবে; এটা মহান আল্লাহ পাক উনার অতি প্রিয় পছন্দের একটি বিষয় যদি তাই হয়ে থাকে, তবে কুরবানীর পশুর রক্ত বৃষ্টির পানিতে প্রবাহিত হয়েছে তো খারাপ কি হয়েছে, বরং মহান আল্লাহ তিনি আরো বেশি খুশি হবেন কারণ এসব রক্ততো আর সন্ত্রাসী আমেরিকার মতো বোমা হামলা করে মানুষ মেরে হয়নি কিংবা ভারতের উগ্র হিন্দুদের মুসলিম গণহত্যার রক্তমিশ্রিত পানি নয় বৃষ্টির পানিতে মিশ্রিত রক্ত মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টির জন্য কুরবানিকৃত পশুর বরকতময় রক্ত বরকতময় রক্ত আরো বেশি প্রবাহিত হোক

১৩

 

মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট পবিত্র কুরবানী উনার পশুর গোশত, রক্ত পৌঁছে না; বরং তোমাদের তাক্বওয়া পৌঁছে থাকে

মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট পবিত্র কুরবানী উনার পশুর গোশত, রক্ত পৌঁছে না; বরং তোমাদের তাক্বওয়া পৌঁছে থাকে।

 

পবিত্র কুরবানী উনার মূল বিষয়ই হচ্ছে তাক্বওয়া বা খুলূছিয়াত।

যারা তাক্বওয়া বা খুলূছিয়াতের সাথে পবিত্র কুরবানী করেছেন, তারাই মহান আল্লাহ পাক উনার এবং উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের সন্তুষ্টি-রেযামন্দি মুবারক হাছিল করেছেন।

 

অতএব, সকলের জন্যই ফরয-ওয়াজিব হচ্ছে- হক্কানী-রব্বানী মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত গ্রহণ করে সবক্ব আদায় করার সাথে সাথে ছোহবত মুবারক ইখতিয়ার করার মাধ্যমে ফয়েয-তাওয়াজ্জুহ হাছিল করে ইখলাছ বা তাক্বওয়া মুবারক হাছিল করা।

যামানার লক্ষ্যস্থল ওলীআল্লাহ, যামানার ইমাম ও মুজতাহিদ, ইমামুল আইম্মাহ, মুহইউস সুন্নাহ, কুতুবুল আলম, মুজাদ্দিদে আযম, ক্বইয়ূমুয যামান, জাব্বারিউল আউওয়াল, ক্বউইয়্যূল আউওয়াল, সুলত্বানুন নাছীর, হাবীবুল্লাহ, জামিউল আলক্বাব, আওলাদে রসূল, মাওলানা সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুল উমাম আলাইহিস সালাম তিনি বলেন, মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র সূরা কাওছার শরীফ উনার মধ্যে সামর্থ্যবান বান্দা-বান্দীকে উনার সন্তুষ্টি মুবারক অর্জনের লক্ষ্যে পবিত্র কুরবানী করার জন্য সরাসরি নির্দেশ মুবারক প্রদান করেছেন। যেমন- মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, আপনার মহান রব তায়ালা উনার (সন্তুষ্টি মুবারকের) জন্য পবিত্র নামায আদায় করুন এবং পবিত্র কুরবানী করুন।

আর নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, তোমরা খুশি মনে ইখলাছ বা আন্তরিকতার সাথে পবিত্র কুরবানী করো।

মহান আল্লাহ পাক তিনি আরো ইরশাদ মুবারক করেন, মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট পবিত্র কুরবানী উনার পশুর গোশত, রক্ত পৌঁছে না, বরং তোমাদের তাক্বওয়া পৌঁছে থাকে। সুবহানাল্লাহ!

মুজাদ্দিদে আযম, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুল উমাম আলাইহিস সালাম তিনি বলেন, মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র সূরা বাইয়্যিনাহ শরীফ উনার ৫ নম্বর পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন, তাদেরকে (ঈমানদারদেরকে) শুধু এ নির্দেশ মুবারকই দেয়া হয়েছে যে, তারা যেন খালিছভাবে অর্থাৎ ইখলাছ মুবারক উনার সাথে মহান আল্লাহ পাক উনার ইবাদত করে।

আর পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি ওই সমস্ত আমল কবুল করবেন না; যা ইখলাছ মুবারক উনার সাথে মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি মুবারক উনার জন্য করা হয় না।

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি তোমাদের আকৃতি বা ধন-সম্পদের প্রতি লক্ষ্য করেন না, বরং তিনি তোমাদের নিয়ত ও অন্তরের (ইখলাছের) দিকে লক্ষ্য করেন।

মুজাদ্দিদে আযম, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুল উমাম আলাইহিস সালাম তিনি বলেন, মহান আল্লাহ পাক তিনি ও উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনারা পশুর কোনো কিছুই গ্রহণ করেন না। উনারা দেখেন- কে উনাদের সন্তুষ্টি মুবারক হাছিলের জন্য উনাদের নির্দেশ মুবারক মুতাবিক পবিত্র কুরবানী করলো। আর কে গাইরুল্লাহর জন্য নিজের খেয়াল-খুশি মতো পবিত্র কুরবানী করলো।

মুজাদ্দিদে আযম, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুল উমাম আলাইহিস সালাম তিনি বলেন, তাক্বওয়া বা ইখলাছ ব্যতীত পাহাড়সম আমলও কোনো উপকারে আসবে না। তাই তাক্বওয়া বা ইখলাছ অর্জন করা ফরয। অতএব, সকলের জন্যই ফরয-ওয়াজিব হচ্ছে, হক্কানী-রব্বানী মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত গ্রহণ করে সবক্ব আদায় করার সাথে সাথে ছোহবত মুবারক ইখতিয়ার করার মাধ্যমে ফয়েয-তাওয়াজ্জুহ হাছিল করে ইখলাছ বা তাক্বওয়া মুবারক হাছিল করা। আর হক্কানী-রব্বানী শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত গ্রহণ করা ব্যতীত ইছলাছ বা তাক্বওয়া হাছিল করা কস্মিনকালেও সম্ভব নয়।

মুজাদ্দিদে আযম, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুল উমাম আলাইহিস সালাম তিনি বলেন, যারা তাক্বওয়া বা খুলূছিয়াতের সাথে পবিত্র কুরবানী করেছেন তারাই মহান আল্লাহ পাক উনার ও উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের রেযামন্দি মুবারক হাছিল করেছেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তি মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট অধিক সম্মানিত, যে ব্যক্তি অধিক মুত্তাক্বী।

অর্থাৎ যিনি পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনার অধিক অনুসরণকারী। সুবহানাল্লাহ!

মুজাদ্দিদে আযম, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুল উমাম আলাইহিস সালাম তিনি বলেন, মূলকথা হলো- পবিত্র কুরবানী উনার মূল বিষয়ই হচ্ছে তাক্বওয়া বা খুলূছিয়াত। যারা তাক্বওয়া বা খুলূছিয়াতের সাথে পবিত্র কুরবানী করেছেন তারাই মহান আল্লাহ পাক উনার ও উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের রেযামন্দি মুবারক হাছিল করেছেন। অতএব, সকলের জন্যই ফরয-ওয়াজিব হচ্ছে, হক্কানী-রব্বানী মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত গ্রহণ করে সবক্ব আদায় করার সাথে সাথে ছোহবত মুবারক ইখতিয়ার করার মাধ্যমে ফয়েয-তাওয়াজ্জুহ হাছিল করে ইখলাছ বা তাক্বওয়া মুবারক হাছিল করা। আর হক্কানী-রব্বানী শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত গ্রহণ করা ব্যতীত ইছলাছ বা তাক্বওয়া হাছিল করা কস্মিনকালেও সম্ভব নয়।

 

১৪

সুওয়াল : যে ব্যক্তির উপর কুরবানী ওয়াজিব, সে তার নিজের নামে কুরবানী না দিয়ে মৃত বা জীবিত পিতা-মাতার নামে কুরবানী দিলে তার নিজের কুরবানী আদায় হবে কিনা?

জাওয়াব: আমাদের হানাফী মাযহাব মতে মালিকে নিছাব প্রত্যেকের উপর আলাদাভাবে কুরবানী করা ওয়াজিব। যার উপর কুরবানী ওয়াজিব তার পক্ষ থেকেই কুরবানী করতে হবে। যার উপর কুরবানী ওয়াজিব সে তার নামে কুরবানী না করে মৃত বা জীবিত অপরের নামে কুরবানী করলে ওয়াজিব তরকের কারণে সে কঠিন গুনাহে গুনাহগার হবে। যদিও বাবা মা-এর নামে কুরবানী করে; যাদের প্রতি কুরবানী ওয়াজিব নয়।

(দলীলসমূহ: আলমগীরী, শামী, নুরুল হিদায়া, বাজ্জাজিয়া, কাযীখান, দুররুল মুখতার, আইনুল হিদায়া, নাওয়াদিরুল ফতওয়া, আইনুল হিদায়া ও বাহর ইত্যাদি।)

১৫

সুওয়াল : মুসাফিরের উপর কি কুরবানী করা ওয়াজিব?

জাওয়াব: কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার জন্য শর্ত হচ্ছে- () মুসলমান হওয়া, () স্বাধীন হওয়া, () মুক্বীম হওয়া, () বালেগ হওয়া, () মালিকে নেছাব হওয়া। কাজেই মুসাফিরের উপর কুরবানী করা ওয়াজিব নয়, যদিও সে মালিকে নেছাব হোক না কেন। কিন্তু যদি সে কুরবানী করে, তবে আদায় হয়ে যাবে।

(দলীলসমূহ: আলমগীরী, শামী, নুরুল হিদায়া, বাজ্জাজিয়া, কাযীখান, দুররুল মুখতার, আইনুল হিদায়া, নাওয়াদিরুল ফতওয়া, আইনুল হিদায়া ও বাহর ইত্যাদি।)

১৬

সুওয়াল : কুরবানীর পশুর চামড়া বিক্রি করে সে টাকা মসজিদ কিংবা ঈদগাহের ইমামকে দেয়া জায়িয হবে কিনা?

জাওয়াব: মসজিদ ও ঈদগাহে ইমামতি করা বাবদ উক্ত টাকা ইমাম ছাহেবকে দেয়া জায়িয হবে না। অবশ্য ইমাম ছাহেব যদি ফিতরা ও কুরবানীর ছাহিবে নিছাব না হন, তাহলে দান হিসেবে উক্ত টাকা নিতে পারেন। কিন্তু ছাহিবে নিছাব হলে, তা নিতে পারবেন না। আর চামড়া বিক্রয় না করে পুরো চামড়াটিই যদি ইমাম সাহেবকে হাদিয়া হিসেবে দেয়া হয়, তবে ইমাম ধনী হলেও তা নিতে পারবেন। তবে চামড়া বিক্রি করলে তার মূল্য গরিব-মিসকীনদেরকে দিয়ে দিতে হবে।

(দলীলসমূহ: আলমগীরী, শামী, নুরুল হিদায়া, বাজ্জাজিয়া, কাযীখান, দুররুল মুখতার, আইনুল হিদায়া, নাওয়াদিরুল ফতওয়া, আইনুল হিদায়া ও বাহর ইত্যাদি।)

১৬

সুওয়াল: মৃত ব্যক্তির নামে কুরবানী করা জায়িয কিনা?

জাওয়াব: কুরবানী মহান আল্লাহ পাক উনার নাম মুবারক-এ করতে হবে। যেমন-
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলে কুরবানী করতে হবে।
এখন যদি কেউ কোনো ব্যক্তির নামে, হোক সে জীবিত অথবা মৃত-এর নামে করে, যেমন- বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার এর পরিবর্তে আব্দুর রহীম, আব্দুল করীম, বকর, যায়িদ, আমর ইত্যাদি নামে কুরবানী করে, তাহলে কুরবানী অশুদ্ধ হবে। উক্ত পশুর গোশ্ত খাওয়াও হারাম হবে ও সাথে সাথে কুফরী ও কবীরা গুনাহ হবে। মূলত, কুরবানী একমাত্র মহান আল্লাহ পাক উনার নাম মুবারক-এই করতে হবে। তবে পশুতে সাত নাম ও এক নাম দেয়ার কথা যে উল্লেখ করা হয়েছে, তাহলো- সাতজন অথবা একজন (চাই তারা জীবিত হোক অথবা মৃত হোক)-এর তরফ থেকে বা পক্ষ থেকে আল্লাহ পাক উনার নাম মুবারক-এ কুরবানী করা।
এ মাসয়ালাটি না বুঝার কারণে অনেকে সরাসরি বলে থাকে, কুরবানীর পশুতে মৃত পূর্ব পুরুষদের নাম দেয়া যাবে না। নাউযুবিল্লাহ!

(দলীলসমূহ: আলমগীরী, শামী, নুরুল হিদায়া, বাজ্জাজিয়া, কাযীখান, দুররুল মুখতার, আইনুল হিদায়া, নাওয়াদিরুল ফতওয়া, আইনুল হিদায়া ও বাহর ইত্যাদি।)

১৭

উলামায়ে সূ বা ধর্মব্যবসায়ীদের মাদ্রাসাতে পবিত্র কুরবানীর পশুর চামড়া দিলে গুনাহ হবে

বর্তমানে অধিকাংশ মাদ্রাসাগুলোই হচ্ছে জামাতী, ওহাবী, খারিজী; দেওবন্দী ক্বওমী মতাদর্শের তথা সন্ত্রাসী তৈরির কেন্দ্র সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার দোহাই দিয়ে, সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার নামে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক স্বার্থ প্রতিপত্তি হাছিলের প্রকল্প সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার নামে নির্বাচন করার ভোটের রাজনীতি করার পাঠশালা- যা সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার মধ্যে সম্পূর্ণ হারাম কাজেই, জামাতী, খারিজী, তাবলীগী, ওহাবী সন্ত্রাসী মৌলবাদী তথা ধর্মব্যবসায়ীদের মাদ্রাসাতে পবিত্র কুরবানীর পশুর চামড়া দিলে তা কস্মিনকালেও আদায় হবে না খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন, তোমরা নেককাজে পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য করো বদকাজে পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য করো না আর বিষয়ে খালিক্ব, মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনাকে ভয় করো নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি কঠিন শাস্তিদাতা (পবিত্র সূরা মায়িদা শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ- ) আফদ্বালুন নাস বাদাল আম্বিয়া হযরত ছিদ্দীক্বে আকবর আলাইহিস সালাম তিনি পবিত্র যাকাতের পশুর একটি রশির জন্যও জিহাদ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন কাজেই পবিত্র যাকাতের একটি রশির মতোই পবিত্র কুরবানীর পশুর একটি চামড়াও যাতে ভুল উদ্দেশ্যে ভুল পথে পরিচালিত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে কাজেই পবিত্র কুরবানীর চামড়া দিয়ে যারা ছদকায়ে জারীয়ার ছওয়াব হাছিল করতে চান, তাদের জন্য একমাত্র প্রকৃত স্থান হলো মুহম্মদিয়া জামিয়া শরীফ-সুন্নতী মাদরাসা ইয়াতীমখানা ৫নং আউটার সার্কুলার রোড, রাজারবাগ, ঢাকা

১৮

 

যেসব দোষযুক্ত পশু কুরবানী করা নিষেধ

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে- . অর্থ:- হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার থেকে বর্ণিত তিনি বলেন- নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি আমাদেরকে নির্দেশ মুবারক দিয়েছেন, আমরা যেন (পবিত্র কুরবানীর পশুর) চোখ কান উত্তমরূপে দেখে নেই এবং আমরা যেন পবিত্র কুরবানী না করি সেসব পশু দ্বারা, যেসব পশুর কানের অগ্রভাগও শেষ ভাগ কাটা অথবা কান গোলাকারে ছিদ্র বা যার কান পাশের দিকে (তিরমিযী শরীফ, আবু দাউদ শরীফ, নাসায়ী শরীফ দারিমী শরীফ) অন্য পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে- . অর্থ:- হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার থেকে বর্ণিত তিনি বলেন- নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি নিষেধ করেছেন, আমরা যেন শিং ভাঙ্গা কান কাটা পশু দ্বারা পবিত্র কুরবানী না করি (ইবনে মাজাহ শরীফ) আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে, . অর্থ:- হযরত বারা ইবনে আযিব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, একবার নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, পবিত্র কুরবানীর জন্য কোনো রকমের পশু হতে বেঁচে থাকা উচিত? নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি আপন হাত মুবারক দ্বারা ইশারা করে বললেন, চার রকমের পশু হতে যেমন- . খোড়া- যার খোঁড়ামি সুস্পষ্ট . কানা- যার কানামি সুস্পষ্ট . রুগ্ন- যার রোগ সুস্পষ্ট . দুর্বল- যার হাড়ের মজ্জা নাই অর্থাৎ শুকিয়ে গেছে (তিরযিমী শরীফ, আবু দাউদ শরীফ, নাসাঈ শরীফ, ইবনে মাজাহ শরীফ, দারিমী শরীফ) অর্থাৎ নিম্নোক্ত দোষ-ত্রুটিযুক্ত পশু কুরবানী করলে কুরবানী ছহীহ হবে না- . দৃষ্টিহীনতা সুস্পষ্ট, . অতি রুগ্ন, . খোড়া, . এমন জীর্ণ-শীর্ণ যে তার হাড়ে মগজ নেই, . কানের অগ্রভাগ অথবা পশ্চাদভাগ কর্তিত, . কান ফাঁড়া, . কান গোলাকার ছিদ্রযুক্ত, . শিং ভাঙ্গা, . পঙ্গু, ১০. চক্ষুহীন

 

 

১৯

 

পশু কুরবানী করার সুন্নতী পদ্ধতি ও নিয়ত

পবিত্র কুরবানী উনার পশুর মাথা দক্ষিণ দিকে এবং পা পশ্চিম দিকে রেখে অর্থাৎ ক্বিবলামুখী করে শোয়ায়ে পূর্ব দিক থেকে চেপে ধরতে হবে, তারপর কুরবানী করতে হবে আর পবিত্র কুরবানী করার সময় খেয়াল রাখতে হবে যে, সিনার উনার অর্থাৎ গলার নীচে নরম স্থানের উপরে কন্ঠনালীর নীচে মাঝামাঝি স্থানে যেন যবেহ করা হয় আরো উল্লেখ্য যে, গলাতে চারটি রগ রয়েছে, তন্মধ্যে গলার সম্মুখভাগে দুটি- খাদ্যনালী শ্বাসনালী এবং দুপার্শ্বে দুটি রক্তনালী চারটির মধ্যে খাদ্যনালী, শ্বাসনালী এবং দুটি রক্তনালীর মধ্যে একটি অবশ্যই কাটতে হবে অর্থাৎ চারটি রগ বা নালীর মধ্যে তিনটি অবশ্যই কাটতে হবে, অন্যথায় পবিত্র কুরবানী হবে না যদি সম্ভব হয়, তবে ছুরি চালানোর সময় বেজোড় সংখ্যার প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে পবিত্র কুরবানী উনার নিয়ত: ইন্নী ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া লিল্লাজি ফাত্বারাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদা হানীফাও ওয়ামা আনা মিনাল মুশরিকীন ইন্না ছলাতী ওয়া নুসুকী ওয়া মাহ্ইয়া ইয়া ওয়া মামাতী লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন লা শারীকালাহু ওয়া বি যালিকা উমিরতু ওয়া আনা মিনাল মুসলিমীন আল্লাহুম্মা মিনকা লাকা দোয়া পড়ে বিস্মিল্লাহি আল্লাহু আকবর বলে জবেহ করতে হবে যবেহ করার পর দোয়া পড়বেন: আল্লাহুম্মা তাক্বাব্বালহু মিন্নী কামা তাক্বাব্বালতা মিন হাবীবিকা সাইয়্যিদিনা হাবীবানা রসূলিনা ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওয়া হযরত খালীলিকা আলাইহিস সালাম যাবিহীকা আলাইহিস সালাম যদি নিজের কুরবানী হয়, তবে মিন্নী বলতে হবে আর যদি অন্যের কুরবানী হয়, তবে মিন শব্দের পর যার বা যাদের কুরবানী তার বা তাদের নাম উল্লেখ করতে হবে আর যদি অন্যের সাথে শরীক হয়, তাহলে মিন্নী বলবেন, অতঃপর মিন বলে অন্যদের নাম বলতে হবে কেউ যদি উপরোক্ত নিয়ত না জানে, তাহলে জবেহ করার সময় শুধু বিস্মিল্লাহি আল্লাহু আকবর বলে পবিত্র কুরবানী করলেও শুদ্ধ হয়ে যাবে কারণ নিয়ত অন্তরের সাথে সম্পর্কযুক্ত তবে অবশ্যই প্রত্যেক যবেহকারীর উচিত উপরোক্ত নিয়ত শিক্ষা করা কেননা উপরোক্ত নিয়ত পাঠ করে পবিত্র কুরবানী করা সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত {দলীলসমূহ:- আহমদ, আবূ দাউদ, তিরমীযী, দারিমী ইবনে মাযাহ, বজলূল মযহুদ, মিশকাত, মিরকাত, মুজাহেরে হক্ব, লুমায়াত, ত্বীবী, তালিক্ছ্ ুছবীহ, আশয়াতুল লুমায়াত, আলমগীরী, শামী, দুররুল মুখতার, আইনুল হিদায়া বাহর ইত্যাদি}

২০

পবিত্র কুরবানী উনার জবাইকৃত পশুর যে সমস্ত অংশগুলো খাওয়া নিষেধ ॥

পবিত্র কুরবানী বা হালাল পশুর ৮টি অংশ খাওয়া যাবে না ০১. দমে মাছফূহা বা প্রবাহিত রক্ত যা হারাম ০২. গুটলী বা গোদুদ খাওয়াও হারাম ০৩. -কোষ ০৪. মূত্রথলী ০৫. পিত্ত ০৬. ছোট ইস্তিঞ্জার রাস্তা বা লিঙ্গ ০৭. বড় ইস্তিঞ্জার রাস্তা বা গুহ্যদ্বার ৫টি অংশ খাওয়া মাকরূহ তাহরীমী এবং ০৮. শিরদাড়ার ভিতরের মগজ, এটা কেউ মাকরূহ তাহরীমী, আবার কেউ মাকরূহ তানযীহী বলেছেন (শামী, মাতালিবুল মুমিনীন, উমদাতুল কালাম, কিতাব-শাইখুল ইসলাম) উপরোক্ত বিষয়গুলোর প্রতি পবিত্র কুরবানী দাতা উনাদের খেয়াল রাখতে হবে

২১

পবিত্র কুরবানী উনার পশু নিজ হাতে যবেহ করা খাছ সুন্নত মুবারক

পবিত হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে- : . অর্থ:- হযরত আনাস ইবনে মালিক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন- নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি এক ঈদে ধুসর রংয়ের শিংদার হৃষ্টপুষ্ট দুটি দুম্বা কুরবানী মুবারক করলেন। তিনি উনাদেরকে নিজ হাত মুবারকে যবেহ করলেন এবং (যবেহ করার সময়) বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবর বললেন। হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, আমি উনাকে (যবেহ করার সময়) পশুর পাঁজরের উপর উনার ক্বদম মুবারক রাখতে এবং বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবর বলতে শুনেছি। (বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ, মিশকাত শরীফ বাবু ফিল উদ্বইয়্যিাহ) উপরোক্ত পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, পবিত্র কুরবানী উনার পশু নিজ হাতে ছুরি দ্বারা যবেহ করা খাছ সুন্নত মুবারক। মেশিনে যবেহ করা নাজায়িয অর্থাৎ যবেহ ও কুরবানী উভয়টাই বাতিল হওয়ার কারণ।`

২২

শেষ মুঘল বাদশাহ বাহাদুর শাহ জাফর থেকে ইন্দিরা গান্ধী: যেকোনো শাসকগোষ্ঠীর নির্বংশ হওয়ার জন্য কুরবানীর বিরোধিতা করাটাই যথেষ্ট

আমাদের পাক-ভারত উপমহাদেশে এমন বহু শাসক রয়েছে, যাদের পতন হয়েছে কুরবানীর বিরোধিতা করার কারণে। গরু কুরবানীর বিরোধী শাসকদের মধ্যে হিন্দু যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে উলামায়ে সূ বা ধর্মব্যবসায়ীদের দ্বারা বিভ্রান্ত মুসলমান শাসকগোষ্ঠী। তাদের সবাইকেই ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়েছে, কিন্তু হিন্দুর চেয়ে মুসলমান নামধারী যেসব শাসক গরু কুরবানীর বিরোধিতা করেছিল, তাদের শাস্তি হয়েছিল বেশি।

সবচেয়ে বড় কথা, ঐসব শাসকদের প্রত্যেকেই দুনিয়াবী দৃষ্টিকোণ থেকে প্রচুর ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার পরও কেবল গরু কুরবানীর বিরোধিতা করার কারণে ক্ষমতাচ্যুত কিংবা নিহত হয়েছিল। তারা নিজেরা তো বটেই, এমনকি তাদের পরিবারের সদস্যরাও মৃত্যুমুখ থেকে বাঁচতে পারেনি। উদাহরণস্বরূপ ইন্দিরা গান্ধীর কথাই উল্লেখ করা যায়। ইন্দিরা গান্ধী ১৯৬৬ ঈসায়ীতে সর্বপ্রথম ভারতের ক্ষমতায় বসে, আর সেই বছরই ভারতে ব্যাপকভাবে গো-রক্ষা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে বিবস্ত্র হিন্দু সন্ন্যাসীদের নেতৃত্বে।

ভারতীয় লেখক শৈলেশকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত দাঙ্গার ইতিহাস বইতে এ দাঙ্গার সূত্রপাত প্রসঙ্গে উল্লেখ রয়েছে- .গোহত্যা বিরোধী যে আন্দোলন চলছিল তাও মুসলমান-হিন্দুর মধ্যে দুরত্বের সৃষ্টি করে। শঙ্করাচার্য ও অন্য হিন্দু ধর্মীয় নেতারা এ আন্দোলনের পুরোধার ভূমিকা নিয়ে ধর্মীয় সভা, কথা ইত্যাদির মাধ্যমে হিন্দু অস্মিতা বৃদ্ধি করার সঙ্গে সঙ্গে এ প্রচার করতে থাকে যে, মুসলমানদের মন পাবার জন্য সরকার সম্পূর্ণ গোবধ বন্ধ করার আইন রচনা করছে না। (পৃষ্ঠা ৮৬) দাঙ্গার ভয়াবহতা সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে যে-কোনো কোনো পাড়ায় আক্রমণকারীরা ভোটার তালিকা নিয়ে মুসলমানদের বাড়ি খুঁজে বের করে। মুসলমান উনাদের জ্বলন্ত বাড়ি ও দোকানগুলো দেখতে দাঙ্গাবাজ হিন্দু নারী-পুরুষরা মেলা দেখার মতো ভিড় জমায়। মুসলমানদের আর্তচিৎকার ছাপিয়ে জয় জগন্নাথ রোল উঠে। কোথাও কোথাও দর্শকদের প্রসাদ বণ্ঠন করা হয়। সম্ভ্রমহানি, বস্ত্রহরণ ও বিবস্ত্র অবস্থায় মুসলমান নারীদের পথ পরিক্রমা করতে বাধ্য করাসহ নারী নির্যাতনের এমনসব পৈশাচিক পন্থা অবলম্বন করা হয়েছিল যার বর্ণনা দেয়া ভদ্ররুচির বিরুদ্ধ। (দাঙ্গার ইতিহাস, শৈলেশকুমার বন্দোপাধ্যায়, মিত্র এন্ড ঘোষ পাবলিশার্স, কলকাতা, পৃষ্ঠা ৯১) ইন্দিরা গান্ধী প্রথম দফায় ক্ষমতায় ছিল ১৯৬৬ ঈসায়ী থেকে ১৯৭৭ ঈসায়ী পর্যন্ত। এর পরের দফায় ১৯৮০ ঈসায়ীতে সে ফের ক্ষমতায় আসে। এই সময়ে তার উত্তরাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হতে থাকে তার ছোট ছেলে সঞ্জয় গান্ধীকে। এই সঞ্জয় গান্ধী সম্পর্কে কলামিস্ট বদরুদ্দীন উমর মন্তব্য করেছে- ইন্দিরা গান্ধীর ছেলে সঞ্জয় গান্ধী দিল্লিতে গরুর গোশত নিষিদ্ধ করে এবং জুমা মসজিদের পাশে যে বিখ্যাত কাবাবের দোকানগুলো ছিল, সেগুলো সব উঠিয়ে দেয়। (সূত্র: দৈনিক সমকাল, ভারতের গরু সমস্যা, ২রা আগস্ট ২০১৬ ঈসায়ী) এই সঞ্জয় গান্ধী ১৯৮০ সালে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হয়। ১৯৮৪ সালে সঞ্জয়ের মা ইন্দিরা গান্ধীও তার শিখ দেহরক্ষীদের দ্বারা নিহত হয়। ইন্দিরার পর তার ছেলে রাজীব গান্ধী ক্ষমতায় আসে, যে ১৯৮৯ সালে উগ্র তামিল সন্ত্রাসীদের দ্বারা আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হয়। অর্থাৎ গরু কুরবানীর বিরোধিতা করার কারণেই এই গান্ধী পরিবারের উপর মহান আল্লাহ পাক উনার লানত বর্ষিত হলো এবং গান্ধী পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের অপমৃত্যু হলো। তবে এখানে বিষয়টি হলো, ইন্দিরা গান্ধী মুসলমান ছিল না, সে ছিল হিন্দু। মুসলমান নামধারী যেসব বাদশাহ গরু কুরবানীর বিরোধিতা করেছিল, তাদেরকেও কিন্তু পরিবারসহ হত্যাকা-ের শিকার হতে হয়েছিল। মুসলমান দাবি করার পরও তাদের উপর গযবের তীব্রতা এতটুকু কমেনি, এমনকি তাদের অনুগত মুসলিম জনগণকেও সেই গযবের ভাগীদার হতে হয়েছিল। যার নির্মম উদাহরণ হলো শেষ মুঘল বাদশাহ বাহাদুর শাহ জাফর ও তার অধীনস্থ দিল্লীর মুসলিম জনসাধারণ। প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় যে, বাহাদুর শাহ জাফর ছিল চরম স্তরের হিন্দুপ্রেমিক। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহে অবরুদ্ধ দিল্লীতে হিন্দুরা ইংরেজদের চর হিসেবে কাজ করছে, সেটি তাকে বারবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার পরও সে তাতে কর্ণপাত করেনি। ব্রিটিশ লেখক উইলিয়াম ড্যালরিম্পেল তার দি লাস্ট মোগল বইতে এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছে যে- মৌলভী মুহম্মদ সাঈদ অবিলম্বে প্রাসাদে উপস্থিত হয়ে বাদশাহকে ভর্ৎসনার সুরে বলেন যে, হিন্দুরা সবাই ইংলিশদের সমর্থক এবং তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ পুরোপুরি বৈধ। বাদশাহ জাফর ঘোষণা করলো যে, তার দৃষ্টিতে হিন্দু মুসলমান উভয়ই সমান। অতএব, জিহাদ অসম্ভব একটি ব্যাপার। (তথ্যসূত্র: দি লাস্ট মোগল, উইলিয়াম ড্যালরিম্পেল, ঐতিহ্য প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ২২৬) অবরুদ্ধ দিল্লীতে বাহাদুর শাহ জাফর হিন্দুদের তুষ্ট করার জন্য হেন জিনিসটি নেই যা করেনি, যার উল্লেখ তৎকালীন ঐতিহাসিক বর্ণনাগুলোতেই পাওয়া যায়। উইলিয়াম ড্যালরিম্পেল উল্লেখ করেছে যে- এমন একটি বিবরণও পাওয়া গেছে যে বাদশাহ জাফরকে জনৈক ব্রাহ্মণ বলেছিল যে তাকে যদি তিনদিন পর্যন্ত একটি সুরক্ষিত বাড়িতে রেখে দুর্গন্ধযুক্ত একটি আগুনের শিখা সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় সকল সামগ্রী সরবরাহ করা হয়, তাহলে সে নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে যে বাদশাহ বিজয়ী হবে। বাদশাহ এতে অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে তার পূজার সামগ্রী সরবরাহের নির্দেশ দেয়। (পৃষ্ঠা ২৫৭) বাদশাহর আস্কারা পেয়ে হিন্দুদের সাহস এতদূর বৃদ্ধি পায় যে, তারা গরু জবাই করার কারণে দিল্লীতে পাঁচজন মুসলিম কসাইকে প্রকাশ্যে শহীদ করে। ঘটনাটি ঘটেছিল ১৮৫৭ ঈসায়ীর ১৯শে জুলাইতে। এই ভয়াবহ অপরাধের শাস্তিস্বরূপ হিন্দুদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা তো নেয়া হলোই না, উল্টো গরু জবাই করাটাই নিষিদ্ধ করে দিলো বাহাদুর শাহ জাফর! এর দ্বারা গরু জবাই করার অপরাধে মুসলমান হত্যা করাটাও বৈধতা পেল, যার জের এখনও ভারতীয় মুসলমানরা বহন করে আসছে। উইলিয়াম ড্যালরিম্পেল এ প্রসঙ্গে তার বইয়ের ২৮২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছে যে- যেদিন কসাইদের হত্যা করার ঘটনা সংঘটিত হলো, বাদশাহ জাফর সেদিনই গরু জবাই ও গরুর গোশত খাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা ও ফরমান জারি করলো যে, গরুর গোশত খাচ্ছে এমন কাউকে পাওয়া গেলে তাকে কামানের গোলা দিয়ে উড়িয়ে দেয়ার মতো ভয়ঙ্কর শাস্তি দেয়া হবে। (নাউযুবিল্লাহ!) নগর রক্ষীরা অবিলম্বে রাজকীয় ফরমান কার্যকর করার পদক্ষেপ গ্রহণ করে কাবাব বিক্রেতাদের পর্যন্ত গ্রেফতার করলো। এমন একজন কাবাব বিক্রেতা হাফিজ আবদুর রহমান দরবারে মুচলেকা দিলেন যে, তিনি কসাই নন। যুদ্ধে তার মূল ব্যবসা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় অতি সম্প্রতি তিনি কাবাব বিক্রি করে জীবিকানির্বাহ করছেন। কিন্তু তাকে মুক্তি দেয়া হয়নি। এছাড়া বাদশাহ আরেকটি ফরমান জারি করে যে, নগরীর সকল গরুকে তালিকাভুক্ত করাতে হবে। বিভিন্ন মহল্লার চৌকিদার ও মেথরদের নির্দেশ দেয়া হলো গরু আছে এমন মুসলিমদের ব্যাপারে কোতোয়ালিতে রিপোর্ট করতে। তাহলে কোতোয়ালি একটি তালিকা প্রস্তুত করতে পারবে যে মুসলমান নাগরিকেরা কতগুলো গরু পালন করছে এবং সে তালিকা প্রাসাদে পাঠানো হবে। ছয় ঘণ্টার মধ্যে এই আদেশ কার্যকর করার নির্দেশ দেয়া হলো। ৩০শে জুলাই কোতোয়াল সাঈদ মুবারক শাহকে নগরীতে ঘোষণা করতে বলা হলো যে, গরু জবাই সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ হয়েছে।

আমাদের পাক-ভারত উপমহাদেশে এমন বহু শাসক রয়েছে, যাদের পতন হয়েছে কুরবানীর বিরোধিতা করার কারণে। গরু কুরবানীর বিরোধী শাসকদের মধ্যে হিন্দু যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে উলামায়ে সূ বা ধর্মব্যবসায়ীদের দ্বারা বিভ্রান্ত মুসলমান শাসকগোষ্ঠী। তাদের সবাইকেই ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়েছে, কিন্তু হিন্দুর চেয়ে মুসলমান নামধারী যেসব শাসক গরু কুরবানীর বিরোধিতা করেছিল, তাদের শাস্তি হয়েছিল বেশি। সবচেয়ে বড় কথা, ঐসব শাসকদের প্রত্যেকেই দুনিয়াবী দৃষ্টিকোণ থেকে প্রচুর ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার পরও কেবল গরু কুরবানীর বিরোধিতা করার কারণে ক্ষমতাচ্যুত কিংবা নিহত হয়েছিল। তারা নিজেরা তো বটেই, এমনকি তাদের পরিবারের সদস্যরাও মৃত্যুমুখ থেকে বাঁচতে পারেনি। যার মধ্যে রয়েছে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের সময় দিল্লীর মুঘল বাদশাহ বাহাদুর শাহ জাফর থেকে শুরু করে হাল আমলের যালিম শাসক ইন্দিরা গান্ধীও। (গত পর্বের পর) এরকম কঠোর যুলুম করেও বাহাদুর শাহ জাফর ক্ষান্ত হলো না। সে দিল্লীর মুসলমানদের সব গরুগুলো বাজেয়াপ্ত করে তা দিল্লীর প্রধান থানা অর্থাৎ কোতোয়ালীতে রাখার ফরমান জারি করল, যেন কেউ গরু কুরবানী করতে না পারে। এতে করে কোতোয়াল সাঈদ মুবারক শাহ অত্যন্ত আতঙ্কিত হয়ে দরবারে লিখে পাঠায় যে, যদি দিল্লীর সকল মুসলমানের গরু কোতোয়ালিতে এনে রাখা হয়, তাহলে তার সংখ্যা ৫০০ থেকে ১ হাজারে দাঁড়াতে পারে। এজন্য আমাদের একটি বিরাট মাঠ দরকার, যেখানে এতগুলো গরু রাখা যেতে পারে। কিন্তু এই অনুগত খাদেম এমন কোন জায়গা সম্পর্কে জানে না। অনিবার্য কারণে এই উদ্ভট পরিকল্পনা নাকচ হয়ে গেল এবং এর পরিবর্তে গরুর মালিক সকল মুসলমানদের কাছ থেকে মুচলেকা নেয়া হল যে, তারা তাদের গরু কুরবানী করবে না। সেই বছর দিল্লীতে পহেলা আগস্টে ঈদুল আযহা উদযাপিত হল, যেখানে কোনো গরু কুরবানী করতে দেয়া হলো না। হার্ভে গ্রেটহেট নামক এক ইংরেজ তার স্ত্রীর নিকট লেখা চিঠিতে উল্লেখ করে যে, দ্বীন ইসলাম উনার জন্য মুসলমানরা যুদ্ধ করছে, ব্যাপারটি অনেকটা রসিকতার মতো। বাদশাহ মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও ঈদ উপলক্ষে কাউকে একটা গরু কুরবানীর অনুমতি দেয়া হয়নি। (তথ্যসূত্র: দি লাস্ট মোগল, উইলিয়াম ড্যালরিম্পেল, ঐতিহ্য প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ২৮৩) উক্ত ইংরেজ তার চিঠিতে যে রসিকতার কথা উল্লেখ করেছিল, সেটা কার সাথে করা হয়েছিল? সেই রসিকতা করা হয়েছিল স্বয়ং দ্বীন ইসলাম উনার সাথে, স্বয়ং আল্লাহ পাক উনার সাথে। নাউযুবিল্লাহ! সচেতন পাঠকমাত্রই উপরের ঘটনাগুলোর সাথে বর্তমান পরিস্থিতির হুবহু মিল পাবেন, এতে কোনই সন্দেহ নেইএই রসিকতার ফলশ্রুতিতে বাদশাহ জাফর তো বটেই, তার পরিবার থেকে শুরু করে গোটা দিল্লীবাসীর ভাগ্যে এমন বিপর্যয় নেমে আসে, যার নজির গোটা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। পাঠকদের বোঝার সুবিধার্থে বলতে হয়, আমরা স্পেনের ধ্বংস হওয়ার ইতিহাস পড়েছি, বাগদাদের ধ্বংস হওয়ার ইতিহাস পড়েছি। ঠিক সেরকমই মর্মন্তুদ ও নির্মম ছিল ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ হানাদার কর্তৃক দিল্লী ধ্বংস হওয়ার ইতিহাস। কারণ স্পেন ও বাগদাদের ন্যায় দিল্লীতেও ছিল বিরাট বিরাট লাইব্রেরী ও জগৎবিখ্যাত আলিম-উলামাগণ। দিল্লীতে বসবাসকারী তেমনি একজন বিখ্যাত ওলীআল্লাহ ছিলেন হযরত শাহ আবদুল আযীয মুহাদ্দিছ দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি। উনার একজন বিশিষ্ট ছাত্র হযরত ফযলে হক খায়রাবাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি, যাঁকে ১৮৫৭ ঈসায়ীর বিদ্রোহের পর আন্দামানে নির্বাসিত করেছিল যালিম ব্রিটিশরা। বাহাদুর শাহ জাফরের পরিণতি সম্পর্কে তিনি লিখেছিলেন- সেই বাদশাহকে শেষ পর্যন্ত সীমাহীন লাঞ্ছনা, দুশ্চিন্তা ও মর্মবেদনার সহিত সপরিবারে হস্তপদ শৃঙ্খলিত অবস্থায় শহরের দিকে আসতে হল। পথিমধ্যে হাডসন নামক এক যালিম বাদশাহ-তনয় ও পৌত্রকে গুলি করে হত্যা করল। এইভাবে মির্জা মুগল খিজির সুলতানের জীবন অবসান হল। যালিমেরা শাহজাদা দ্বয়ের মৃতদেহ পথিপার্শ্বে ফেলে রেখে মস্তক কর্তন করে আনল এবং একটি সুসজ্জিত পাত্রে স্থাপন করতঃ বাদশাহের সম্মুখে উপহার স্বরূপ পেশ করল। অতঃপর মস্তক দুইটিও চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দূরে নিক্ষেপ করল। অতঃপর কালো অন্তরবিশিষ্ট, সাদা চামড়া ও হলুদ চুলবিশিষ্ট যালিম ইংরেজরা বাদশাহকে সুইয়ের ছিদ্র সদৃশ একটি সংকীর্ণ অন্ধকার কারাকক্ষে বন্দী করে রাখে। এই বিশাল দেশের কোন এক কোণেও তার জন্য একটু স্থান করে দেয়ার মত উদারতাও এরা দেখাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত তাহাকে দেশের বাইরে একটি উপদ্বীপ এলাকায় (বার্মায়) নির্বাসিত করে। (সূত্র: আযাদী আন্দোলন ১৮৫৭, হযরত ফযলে হক খায়রাবাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি, পৃষ্ঠা ২৪) যেই হিন্দুদেরকে বাহাদুর শাহ ও দিল্লীবাসী মুসলমানরা এতো তোয়াজ করেছিল, সেই হিন্দুরা ব্রিটিশদের সাথে হাত মিলিয়ে দিল্লী শহর অধিকার করে মুসলমানদের বিতাড়িত করল। ১৯৬০ সালে এক ব্রিটিশ পত্রিকায় লেখা হয়েছিল- হাজার হাজার মুসলমান গৃহহীন অবস্থায় ঘুরে ঘুরে কাটাচ্ছে, আর হিন্দুরা তাদের আনুগত্যের প্রমাণ দিয়ে রাস্তায় বায়ু সেবন করে বেড়াচ্ছে। দিল্লীর মুসলমানদের সম্পত্তিগুলো সব ব্রিটিশরা নিলামে তুলেছিল এবং সেগুলো সব নামমাত্র মূল্যে কিনে নিয়েছিল দিল্লীর হিন্দু ও জৈন ব্যবসায়ীরা। যার ফলে যেই দিল্লী একদা মুসলিম প্রধান শহর ছিল, তা রাতারাতি হিন্দুপ্রধান শহরে পরিণত হল। (সূত্র: দি লাস্ট মোগল, পৃষ্ঠা ৪৩৩) অর্থাৎ কুরবানীর বিরোধিতা করা তথা গরু জবাইয়ের বিরোধিতা করার গযব কতোটা নির্মম ও ভয়াবহ!