প্রচ্ছদ

৬১) কুরবানী উনার ইতিহাস

৬১) কুরবানী উনার ইতিহাস

আল্লাহ পাক নূরে মুজাসসাম,হাবীবুল্লাহ,হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে বলেন,- ‘আপনি আপনার রব তায়ালা উনার উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুণ ও কুরবানী করুন।’ (সূরা কাওসার : ২)

সামর্থ্যবান মুসলমানদের জন্য কুরবানী করা ওয়াজিব।আমরা ধারাবাহিকভাবে কুরবানীর ইতিহাস,ফযিলত, মাসয়ালা,মাসায়েল সহ আরো বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জানবো ইনশাআল্লাহ৷ পৃথিবীর সর্বপ্রথম কুরবানী: কুরবানীর ইতিহাস খুবই প্রাচীন।আদি পিতা হযরত আদম সফিউল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার যুগ থেকেই কুরবানীর বিধান চলে আসছে। হযরত আদম সফিউল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার দুই ছেলে হযরত হাবীল আলাইহিস সালাম ও কাবীলের কুরবানী পেশ করার কথা আমরা আল-কুরআন উল কারীম থেকে জানতে পারি। মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা‘আলা বলেন,
﴿ ۞وَٱتۡلُ عَلَيۡهِمۡ نَبَأَ ٱبۡنَيۡ ءَادَمَ بِٱلۡحَقِّ إِذۡ قَرَّبَا قُرۡبَانٗا فَتُقُبِّلَ مِنۡ أَحَدِهِمَا وَلَمۡ يُتَقَبَّلۡ مِنَ ٱلۡأٓخَرِ قَالَ لَأَقۡتُلَنَّكَۖ قَالَ إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ ٱللَّهُ مِنَ ٱلۡمُتَّقِينَ ٢٧ ﴾ [المائدة: ٢٧

অর্থাৎ, হযরত আদম সফিউল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার দুই পুত্রের (হযরত হাবিল আলাইহিস সালাম ও কাবিলের) বৃত্তান্ত আপনি তাদেরকে যথাযথভাবে শুনিয়ে দিন, যখন তারা উভয়ে কুরবানী করেছিল, তখন একজনের কুরবানী কবুল হলো এবং অন্যজনের কুরবানী কবুল হলো না। তাদের একজন বলল, ‘আমি আপনাকে অবশ্যই হত্যা করব। অপরজন বলল, ‘আল্লাহ তো সংযমীদের কুরবানীই কবূল করে থাকেন।(পবিত্র সূরা মায়িদা : পবিত্র আয়াত শরীফ ২৭)

মূল ঘটনা হলো: যখন হযরত আদম সফিউল্লাহ আলাইহিস সালাম হযরত হাওওয়া আলাইহাস সালাম উনারা পৃথিবীতে আগমন করেন এবং উনাদের বংশ বিস্তার আরম্ভ হয়, তখন হাওয়া আলাইহাস সালাম উনার প্রতি গর্ভ থেকে জোড়া জোড়া (জময) অর্থাৎ একসাথে একটি পুত্র ও একটি কন্যা এরূপ জময সন্তান জন্মগ্রহণ করত। কেবল হযরত শীশ আলাইহিস সালাম ব্যতিরেকে। কারণ, তিনি একা তাশরীফ নিয়েছিলেন। তখন হযরত আদম সফিউল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার পরিবারই এই ধরার বুকে প্রথম পরিবার।আর কোন পরিবার ছিলো না। তাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা উপস্থিত প্রয়োজনের খাতিরে হযরত আদম সফিউল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার শরীয়তে বিশেষভাবে এ নির্দেশ জারি করেন যে, একই গর্ভ থেকে যে যমজ পুত্র ও কন্যা জন্মগ্রহণ করবে, তারা পরস্পর সহোদর ভাই-বোন হিসেবে গণ্য হবে। তাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম। কিন্তু পরবর্তী গর্ভ থেকে জন্মগ্রহনকারী পুত্রের জন্য প্রথম গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণকারীনি কন্যা সহোদরা বোন হিসেবে গণ্য হবে না। তাদের মধ্যে পরস্পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া বৈধ। সুতরাং সে সময় হযরত আদম সফিউল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার একটি জোড়ার মেয়ের সাথে অন্য জোড়ার ছেলের বিয়ে দিতেন। ঘটনাক্রমে কাবীলের সাথে যে সহোদরা জন্ম নিয়েছিলেন তিনি ছিল পরমা সুন্দরী। উনার নাম ছিল হযরত আকলিমা আলাইহাস সালাম। কিন্তু হযরত হাবিল আলাইহিস সালাম উনার সাথে যে সহোদরা জন্ম নিয়েছিলেন তিনি দেখতে অতটা সুন্দরী ছিল না। উনার নাম ছিল লিওযা। বিবাহের সময় হলে শরয়ী ‘নিয়মানুযায়ী হযরত হাবিল আলাইহিস সালাম উনার সহোদরা বোন কাবীলের ভাগে পড়ল।কিন্তু কাবীল উনাকে না বিয়ে করে নিজের সহোদরা হযরত আকলিমা আলাইহাস সালাম উনাকে বিয়ে করতে চাইল। ফলে হযরত আদম সফিউল্লাহ আলাইহিস সালাম তৎকালীন শরীয়তের আইনের পরিপ্রেক্ষি তে কাবীলের আবদার প্রত্যাখ্যান করলেন এবং তাকে উনার নির্দেশ মানতে বললেন। কিন্তু সে মানল না। এবার তিনি তাকে শাসন করলেন। তবুও সে ঐ শাসনে কান দিল না। অবশেষে হযরত আদম সফিউল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার দু‘সস্তান হযরত হাবীল আলাইহিস সালাম ও কাবীলের মতভেদ দূর করার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘তোমরা উভয়ে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কুরবানী পেশ কর, যার কুরবানী গৃহীত হবে, তার সাথেই আকলিমা উনার বিয়ে দেয়া হবে।’ সে সময় কুরবানী গৃহীত হওয়ার একটি সুস্পষ্ট নিদর্শন ছিল যে, আকাশ থেকে একটি অগ্নিশিখা এসে সে কুরবানীকে ভষ্মীভূত করে ফেলত। আর যার কুরবানী কবূল হতো না তারটা পড়ে থকত। যাহোক, তাদের কুরবানীর পদ্ধতি সম্পর্কে যা জানা যায় তা হলো- কাবীল ছিল চাষী। তাই সে গমের শীষ থেকে ভাল ভাল মালগুলো বের করে নিয়ে বাজে মালগুলোর একটি আটি কুরবানীর জন্য পেশ করল। আর হযরত হাবীল আলাইহিস সালাম ছিল পশুপালনকারী। তাই তিনি উনার জন্তুর মধ্যে থেকে সবচেয়ে সেরা একটি দুম্বা কুরবানীর জন্য পেশ করল। এরপর নিয়মানুযায়ী আকাশ থেকে অগ্নিশিখা এসে হযরত হাবীল আলাইহিস সালাম উনার কুরবানীটি ভষ্মীভুত করে দিল। [ফতহুল ক্বাদীরের বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, হযরত হাবীল আলাইহিস সালাম উনার পেশকৃত দুম্বাটি জান্নাতে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং তা জান্নাতে বিচরণ করতে থাকে। অবশেষে হযরত ইসমাঈল যবিহুল্লাহ উনার সম্মানার্থে ঐ দুম্বাটি পাঠিয়ে দেয়া হয়।] আর কাবীলের কুরবানী যথাস্থানেই পড়ে থাকল। অর্থাৎ হযরত হাবীল আলাইহিস সালাম উনার কুরবানী গৃহীত হলো আর কাবীলেরটি হলো না। কিন্তু কাবীল এ আসমানী সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারল না। এ অকৃতকার্যতায় কাবীলের দুঃখ ও ক্ষোভ আরো বেড়ে গেল। সে আত্মসংবরণ করতে পারল না এবং প্রকাশ্যে তার ভাইকে বলল, ‘আমি অবশ্যই আপনাকে হত্যা করব। হযরত হাবীল আলাইহিস সালাম তখন ক্রোধের জবাবে ক্রোধ প্রদর্শন না করে একটি মার্জিত ও নীতিগত বাক্য উচ্চারণ করল, এতে কাবীলের প্রতি উনার সহানুভূতি ও শুভেচ্ছা ফুটে উঠেছিল। হযরত হাবীল আলাইহিস সালাম বলেছিলেন, ‘ তিনি মুত্তাক্বীর কর্মই গ্রহণ করেন। সুতরাং তুমি তাক্বওয়ার কর্মই গ্রহণ করো। তুমি তাক্বওয়া অবলম্বন করলে তোমার কুরবানীও গৃহীত হতো। তুমি তা করোনি, তাই তোমার কুরবানী প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এতে আমার দোষ কোথায়?…..তবুও এক পর্যায়ে কাবীল হযরত হাবীল আলাইহিস সালাম উনাকে শহীদ করে ফেলল। (তাফসীর ইবনে কাসীর, দুররে মনসূর, ফতহুল বায়ান, ৩/৪৫ ও ফতহুল ক্বাদীর, ২/২৮-২৯)

আল্লাহ পাক নূরে মুজাসসাম,হাবীবুল্লাহ,হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে বলেন,- ‘আপনি আপনার রব তায়ালা উনার উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুণ ও কুরবানী করুন।’ (পবিত্র সূরা কাওসার : ২)

সামর্থ্যবান মুসলমানদের জন্য কুরবানী করা ওয়াজিব।আমরা ধারাবাহিকভাবে কুরবানীর ইতিহাস,ফযিলত, মাসয়ালা,মাসায়েল সহ আরো বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জানবো ইনশাআল্লাহ৷ আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ وَلِكُلِّ أُمَّةٖ جَعَلۡنَا مَنسَكٗا لِّيَذۡكُرُواْ ٱسۡمَ ٱللَّهِ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّنۢ بَهِيمَةِ ٱلۡأَنۡعَٰمِۗ فَإِلَٰهُكُمۡ إِلَٰهٞ وَٰحِدٞ فَلَهُۥٓ أَسۡلِمُواْۗ وَبَشِّرِ ٱلۡمُخۡبِتِينَ ٣٤ ﴾ [الحج: ٣٤]
অর্থাৎ প্রত্যেক উম্মতের জন্য আমি কুরবানীর বিধান রেখেছিলাম, যাতে তারা উক্ত পশু যবেহ করার সময় আল্লাহপাক উনার নাম স্মরণ করে এ জন্য যে, তিনি চতুষ্পদ জন্তু থেকে তাদের জন্য রিযিক নির্ধারণ করেছেন। [সূরা হাজ্জ (২২):৩৪]।

মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে যত শরীয়ত নাযিল হয়েছে, প্রত্যেক শরীয়তের মধ্যে কুরবানী করার বিধান জারি ছিল। প্রত্যেক উম্মতের ইবাদতের এ ছিল একটা অপরিহার্য অংশ। বর্তমান কুরবানীর ইতিহাস :

পবিএ কুরআন শরীফ উনাতে এসেছে-
﴿ رَبِّ هَبۡ لِي مِنَ ٱلصَّٰلِحِينَ ١٠٠ فَبَشَّرۡنَٰهُ بِغُلَٰمٍ حَلِيمٖ ١٠١ فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ ٱلسَّعۡيَ قَالَ يَٰبُنَيَّ إِنِّيٓ أَرَىٰ فِي ٱلۡمَنَامِ أَنِّيٓ أَذۡبَحُكَ فَٱنظُرۡ مَاذَا تَرَىٰۚ قَالَ يَٰٓأَبَتِ ٱفۡعَلۡ مَا تُؤۡمَرُۖ سَتَجِدُنِيٓ إِن شَآءَ ٱللَّهُ مِنَ ٱلصَّٰبِرِينَ ١٠٢ فَلَمَّآ أَسۡلَمَا وَتَلَّهُۥ لِلۡجَبِينِ ١٠٣ وَنَٰدَيۡنَٰهُ أَن يَٰٓإِبۡرَٰهِيمُ ١٠٤ قَدۡ صَدَّقۡتَ ٱلرُّءۡيَآۚ إِنَّا كَذَٰلِكَ نَجۡزِي ٱلۡمُحۡسِنِينَ ١٠٥ إِنَّ هَٰذَا لَهُوَ ٱلۡبَلَٰٓؤُاْ ٱلۡمُبِينُ ١٠٦ وَفَدَيۡنَٰهُ بِذِبۡحٍ عَظِيمٖ ١٠٧ وَتَرَكۡنَا عَلَيۡهِ فِي ٱلۡأٓخِرِينَ ١٠٨ سَلَٰمٌ عَلَىٰٓ إِبۡرَٰهِيمَ ١٠٩ كَذَٰلِكَ نَجۡزِي ٱلۡمُحۡسِنِينَ ١١٠ إِنَّهُۥ مِنۡ عِبَادِنَا ٱلۡمُؤۡمِنِينَ ١١١ ﴾ [الصافات: ١٠٠، ١١١]
অর্থঃ “হযরত ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম যখন আমার কাছে দু‘আ করল, হে আমার রব! আপনি আমাকে এক সৎকর্মশীল পুত্র সন্তান দান করুন। অতঃপর আমি উনাকে এক অতি ধৈর্যশীল পুত্র উনার সুসংবাদ দিলাম। অতঃপর তিনি যখন উনার পিতার সাথে চলাফিরা করার বয়সে পৌঁছল, তখন হযরত ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম বললেন, ‘হে আমার সম্মানিত আওলাদ আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি আপনাকে যবেহ করছি, এখন বলুন, আপনার অভিমত কী? হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম বললেন, ‘হে সম্মানিত পিতা আলাইহিস সালাম ! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তাই করুন, আল্লাহ চাইলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীলই পাবেন। দু‘জনেই যখন আনুগত্যে মাথা নুইয়ে দিল আর হযরত ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনাকে কাত ক‘রে শুইয়ে দিল। তখন আমি হযরত ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনাকে ডাক দিলাম, ‘হে হযরত ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম! স্বপ্নে দেয়া আদেশ আপনি সত্যে পরিণত করেই ছাড়লেন। এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি। অবশ্যই এটা ছিল একটি সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি এক মহান কুরবাণীর বিনিময়ে হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম উনাকে ছাড়িয়ে নিলাম। আর আমি উনাকে পরবর্তীদের মাঝে স্মরণীয় করে রাখলাম। হযরত ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক! সৎকর্মশীলদেরকে আমি এভাবেই প্রতিদান দিয়ে থাকি।তিনি ছিলেন আমার মু‘মিন বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।’’ [সূরা আস- সাফফাত শরীফঃআয়াত শরীফ ১০০-১১১]

ইবনে কাসীর রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা আমাদের জানান যে, উনার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হযরত ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম যখন উনার পিতৃভুমি থেকে হিজরত করলেন, তখন তিনি উনার প্রভুর কাছে চেয়েছিলেন যে, তিনি যেন তাকে সৎকর্মশীল সন্তান দান করেন। তাই আল্লাহ তা‘আলা উনাকে একজন ধৈর্যশীল পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। এটা ছিল হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম উনার ব্যাপারে, কেননা তিনি ছিলেন হযরত ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার ঔরসে জন্ম নেয়া প্রথম সন্তান। এ ব্যাপারে বিভিন্ন দ্বীনের (ইহুদী, খ্রিস্টান ও মুসলিম) অনুসারীদের মধ্যে কোন মতভেদ নেই যে হযরত ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার ঘরে হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম প্রথম জন্মগ্রহণ করেছিলেন। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১/১৫৭-১৫৮)

فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ ٱلسَّعۡيَ
অর্থাৎ ‘এবং যখন তিনি উনার সাথে হাটার মত বড় হলো’- এর অর্থ হচ্ছে, যখন তিনি বড় হয়েছিলেন এবং হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার মতই নিজেই নিজের দেখাশোনা করতে পারতেন। মুজাহিদ রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ‘এবং যখন তিনি উনার সাথে হাটার মত বড় হলো’এর অর্থ হচ্ছে, যখন তিনি বড় হয়ে উঠেছিলেন এবং বাহনে চড়তে পারতেন, হাঁটতে পারতেন এবং উনার বাবার মত কাজ করতে পারতেন।ইবনু আববাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, ঐ সময় তিনি কেবল সাবলকত্বে উপনীত হয়েছিলেন। (তাফসীর কুরতুবী, ১৫/৯৯)

এ রকম একটা অবস্থা যখন আসল, তখন হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম স্বপ্নে দেখলেন যে, উনাকে হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম উনাকে কুরবানী করার আদেশ দেয়া হচ্ছে।হযরত নবী আলাইহিমুস সালাম উনাদের স্বপ্ন হচ্ছে ওহী মুবারক।উনাদের তাদের চক্ষু মুদিত থাকলেও অন্তরচক্ষু খোলা থাকে। সুতরাং আল্লাহ পাক হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনাকে উনার প্রিয়পুত্রকে কুরবানী করার আদেশ দিয়ে পরীক্ষা করছিলেন, যে পুত্রকে তিনি উনার বৃদ্ধাবস্থায় পেয়েছিলেন এবং তারপর শিশু অবস্থায় উনাকে এবং উনার সম্মানিতা মাতা হযরত হাজেরা আলাইহাস সালাম উনাকে মরুভুমিতে রেখে আসার আদেশ পেয়েছিলেন, এমন একটা উপত্যকায় যেখানে কোন জনপ্রাণীর সাড়াশব্দ ছিল না, কোন মানুষজন ছিল না, কোন বৃক্ষরাজি ছিল না এবং কোন পাখ-পাখালী বা পশুও ছিল না। হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম আল্লাহ পাক উনার আদেশ পালন করলেন এবং আল্লাহ পাক উনার উপর ভরসা করে উনাদেরকে সেখানে রেখে আসলেন। আর আল্লাহ পাক উনাদের জন্য অপ্রত্যাশিত উৎস থেকে রিযিক পাঠালেন। এত কিছুর পরেও, হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার ঘরে প্রথম জন্ম নেয়া ও উনার একমাত্র পুত্র উনাকে কুরবানী করার জন্য যখন আদেশ করা হলো, তিনি তখন আল্লাহ পাক উনার ডাকে সাড়া দিলেন এবং আল্লাহ পাক উনার আদেশ মেনে, তিনি যা চেয়েছিলেন, তা করতে উদ্যত হলেন। তাই তিনি হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম উনাকে ব্যাপারটা সম্বন্ধে বললেন,‘হে আমার সম্মানিত আওলাদ আলাইহিস সালাম আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি আপনাকে জবাই করছি (আমি আপনাকে আল্লাহ পাক উনার জন্য কুরবানী করছি)। তাহলে, আপনি কী বলেন এই বিষয়ে!’ হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম সাথে সাথেই জবাব দিলেন, হে আমার সম্মানিত আব্বাজান আলাইহিস সালাম! আপনাকে যে আদেশ করা হয়েছে, আপনি তা-ই করুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন।

আল্লাহ পাক বলেন,
فَلَمَّآ أَسۡلَمَا وَتَلَّهُۥ لِلۡجَبِينِ
‘তারপর উনারা উভয়ে নিজেদেরকে ( আল্লাহ পাক উনার ইচ্ছার কাছে) সমর্পণ করলেন, এবং তিনি উনাকে উনার পার্শ্বে উপর কাত অবস্থায় শুইয়ে দিলেন’ এখানে বলা হয়েছে, ‘যখন উনারা উভয়ে নিজেদেরকে সমর্পণ করলেন’- অর্থ হচ্ছে উনারা দু‘জনে যখন নিজেদেরকে আল্লাহ পাক উনার আদেশের কাছে সমর্পণ করলেন‘এবং তিনি উনাকে শুইয়ে দিলেন’। ‘ উনারা উভয়ে নিজেদের সমর্পণ করলেন। হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম বললেন, ‘আল্লাহু আকবার’ , হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম বললেন, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’।তাফসীরের কিতাবে এসেছে, হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম যখন হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম উনার গলদেশে ছুরি চালান, কিন্তু তা উনাকে কাটেনি। এটা বলা হয়ে থাকে যে, ছুরি উনার গলার মাঝখানে একটা তামার পাত রাখা হয়েছিল।
আল্লাহ পাক বলেন,
﴿ قَدۡ صَدَّقۡتَ ٱلرُّءۡيَآۚ ١٠٥ ﴾ [الصافات: ١٠٥]
অর্থঃ ‘হে হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম! আপনি আপনার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেছেন!’- এর অর্থ হচ্ছে উদ্দেশ্য সাধিত হয়েছে, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে আর আপনি তা যথাযথ পালন করেছেন।

তাই আল্লাহ পাক বলেন,
﴿ إِنَّ هَٰذَا لَهُوَ ٱلۡبَلَٰٓؤُاْ ٱلۡمُبِينُ ١٠٦ ﴾ [الصافات: ١٠٦]
অর্থঃ‘নিশ্চয় এটা ছিল স্পষ্ট পরীক্ষা।’ অর্থাৎ এটা যে একটা পরীক্ষা ছিল তা পুরোপুরি স্পষ্ট। নিঃসন্দেহে এখানে মূল উদ্দেশ্য যবেহ ছিল না, বরং উদ্দেশ্য ছিল পিতা-পুত্রের আনুগত্য ও তাক্বওয়ার পরীক্ষা নেওয়া। সে পরীক্ষায় উভয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন পিতার পূর্ণ প্রস্ত্ততি এবং পুত্রের স্বতঃস্ফুর্ত সম্মতি ও আনুগত্যের মাধ্যমে।

আল্লাহ পাক বলেন, ﴿ وَفَدَيۡنَٰهُ بِذِبۡحٍ عَظِيمٖ ١٠٧ ﴾ [الصافات: ١٠٧] অর্থঃআমি এক মহান কুরবাণীর বিনিময়ে হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম উনাকে ছাড়িয়ে নিলাম। এরপর জান্নাত থেকে আল্লাহ পাক একটা দুম্বা পাঠিয়ে দেন ।সেটাই কুরবানী করা হয় ।সুবহানাল্লাহ

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

সার্চ করুন

সর্বশেষ পোস্ট

ফেসবুকে আমরা

এই সম্পর্কিত আরো পোস্ট সমূহ



৬০) পবিত্র কুরবানী কাকে বলে?

اضحية বা পবিত্র কুরবানী শব্দটি একবচন। বহুবচনে اضاحىএর আভিধানিক অর্থ কুরবানী, উৎসর্গ, পবিত্র কুরবানী উনার পশু ঈদুল আদ্বহার দিন যা যবেহ করা হয়। শরীয়ত উনার

বিস্তারিত পড়ুন

৬১) কুরবানী উনার ইতিহাস

আল্লাহ পাক নূরে মুজাসসাম,হাবীবুল্লাহ,হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে বলেন,- ‘আপনি আপনার রব তায়ালা উনার উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুণ ও কুরবানী করুন।’ (সূরা কাওসার

বিস্তারিত পড়ুন

৬২) পবিত্র কুরআন শরীফ উনার আলোকে পবিত্র কুরবানী

‘কুরবানী’ শব্দের অর্থ হচ্ছে- মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি মুবারক হাছিলের উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহ পাক উনার পবিত্র নাম মুবারকে নির্দিষ্ট তারিখে নির্দিষ্ট নিয়মে নির্দিষ্ট পশু

বিস্তারিত পড়ুন

৬৩) পবিত্র কুরআন শরীফ এবং পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে পবিত্র কুরবানী

খলিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন- انا اعطينك الكوثر فصل لربك وانحر অর্থ: “হে আমার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক

বিস্তারিত পড়ুন