তাকবীরে তাশরীক পাঠ করার শরয়ী বিধান

তাকবীরে তাশরীক পাঠ করার শরয়ী বিধান

পবিত্র যিলহজ্জ শরীফ মাস উনার ৯ তারিখ ফজর থেকে ১৩ তারিখ আছর পর্যন্ত মোট ২৩ ওয়াক্ত ফরয নামাযের পর-

اَللهُ اَكْبَرُ اَللهُ اَكْبَرُ لَا اِلٰهَ اِلَّا اللهُ وَاللهُ اَكْبَرُ اَللهُ اَكْبَرُ وَللهِ الْـحَمْدُ.

উচ্চারণ : “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হাম্দ।”

এই পবিত্র তাকবীর মুবারক পাঠ করতে হয়। উক্ত পবিত্র তাকবীর মুবারক খানাকেই পবিত্র ‘তাকবীরে তাশরীক’ বলে। জামায়াতে বা একাকী, মুসাফির অথবা মুকীম, শহর অথবা গ্রামে পুরুষ-মহিলা প্রত্যেককেই প্রতি ফরয নামাযের পর উক্ত তাকবীর পাঠ করতে হবে।

“দুররুল মুখতার” কিতাবে উল্লেখ আছে যে, “তাকবীরে তাশরীক একবার বলা ওয়াজিব, তবে যদি (কেউ) একাধিকবার বলে, তাহলে তা ফযীলতের কারণ হবে। আর “ফতওয়ায়ে শামী” কিতাবে উল্লেখ আছে-

وَقِيْلَ ثَلَاثُ مَرَّاتٍ

অর্থ : “কেউ কেউ বলেছেন (তাকবীরে তাশ্রীক) তিনবার।”

“গায়াতুল আওতার শরহে দুররুল মুখতার” কিতাবে উল্লেখ আছে-

اور واجب ہے تکبیر تشریق صحیح ترقول میں ایکبار بسبب اسکے مامور ہونے کے اور اگر زیادہ کہےایکبار سے تو ہوگا ثواب۰

অর্থ : “বিশুদ্ধ বর্ণনা মতে (মহান আল্লাহ পাক উনার পক্ষ থেকে) আদিষ্ট হওয়ার কারণে একবার তাকবীরে তাশরীক বলা ওয়াজিব। আর যদি একবারের চেয়ে অতিরিক্ত বলে তবে ছওয়াবের অধিকারী হবে।”

উপরোক্ত নির্ভরযোগ্য কিতাবের বর্ণনা দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে, একবার তাকবীরে তাশরীক বলা ওয়াজিব এবং তিনবার বলা মুস্তাহাব। (শামী, আইনী, আলমগীরী, হাশিয়ায়ে তাহতাবী, রদ্দুল মুহতার, দুররুল মুখতার)

এই সময়ের মধ্যে কেউ যদি পূর্বের (ফরয) ক্বাযা নামায আদায় করে তাহলে উক্ত নামাযের পর তাকে তাকবীরে তাশরীক পাঠ করতে হবে না। তবে আল্লাহ পাক না করুন কারো যদি এ সময়ের মধ্যে নামায ক্বাযা হয় আর উক্ত ক্বাযা নামায ১৩ যিলহজ্জ শরীফ উনার মধ্যে আদায় করা হয় তবে উক্ত ক্বাযা নামায আদায়ের পর প্রতি ওয়াক্তের জন্য তাকবীরে তাশরীক পাঠ করতে হবে। তাছাড়া উক্ত ২৩ ওয়াক্ত নামাযে তাকবীরে তাশরীক পড়তে ভুলে গেলে, স্মরণ হওয়া মাত্রই তা পাঠ করতে হবে।

মূলত নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নূর মুবারক হযরত যবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার মধ্যে অবস্থান করার কারণেই মহান আল্লাহ পাক তিনি হযরত যবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার গলা মুবারক না কাটার জন্য ছুরিকে ৭০ বার আদেশ মুবারক করেন। হযরত যবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার পরিবর্তে মহান আল্লাহ পাক তিনি বেহেশত হতে একটি দুম্বা কুরবানী হিসেবে কবুল করেন। উক্ত দুম্বাটি সম্পর্কে বর্ণিত রয়েছে-

عَنْ حَضْرَتْ اِبْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ فِيْ قَوْلِهِ {وَفَدَيْنَاهُ بِذِبْحٍ عَظِيْمٍ} قَالَ كَبْشٌ قَدْ رَعٰى فِى الْـجَنَّةِ اَرْبِعَيْنَ خَرِيْفًا.

অর্থ : “হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি পবিত্র কুরআন শরীফ উনার পবিত্র আয়াত শরীফ- وَفَدَيْنَاهُ بِذِبْحٍ عَظِيْمٍ (অর্থাৎ আমি এক মহান কুরবানী উনার বিনিময়ে আপনার আওলাদ উনাকে ছাড়িয়ে নিলাম) উনার ব্যাখ্যায় বলেন যে দুম্বাটি জান্নাতে ৪০ বছর বিচরণ করেছিল।” (তাফসীরে দুররে মানছূর শরীফ ১২তম খ- ৪৫০ পৃষ্ঠা, ফতহুল ক্বাদীর ৬ষ্ঠ খ- ২১৪ পৃষ্ঠা)

অন্য বর্ণনায় রয়েছে-

بِكَبْشٍ اَقْرَنَ اَمْلَحَ قَدْ رَعٰى فِى الْـجَنَّةِ اَرْبَعِيْنَ خَرِيْفًا.

অর্থ : “তরুতাজা, সুদর্শন, শিংওয়ালা দুম্বা যা জান্নাতে ৪০ বছর বিচরণ করেছিল।”

আরো বর্ণিত রয়েছে-

فَاِذَا هُوَ بِكَبْشٍ اَمْلَحُ وَاَقْرَنُ كَبُرَ وَهُوْ فِى الْـجَنَّةِ اَرْبِعَيْنَ خَرِيْفَا فَاَخَذَهُ حَضْرَتْ اِبْرَاهِيْمُ عَلَيْهِ الـسَلَامُ وَذَبَـحَهُ

অর্থ : “যেটা একটা তরুতাজা, সুদর্শন, শিংওয়ালা দুম্বা ছিল যেটা জান্নাতে ৪০ বছর বিচরণ করেছিল অতঃপর হযরত খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনি সেটা গ্রহণ করলেন এবং যবেহ করলেন।” (তাফসীরে বাগবী শরীফ ৭ম খ- ৫০ পৃষ্ঠা, তাফসীরে কবীর শরীফ ২৬তম খ- ৩৫১ পৃষ্ঠা)

অর্থাৎ হযরত খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনি উনার প্রিয়তম আওলাদ হযরত যবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার পরিবর্তে যে দুম্বাটি কুরবানী করেছিলেন উক্ত দুম্বাটি আখিরাতের হিসেবে ৪০ বছর জান্নাতে বিচরণ করেছিল। সুবহানাল্লাহ!
উক্ত কুরবানী সম্পর্কে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَا بُنَيَّ اِنِّـيٓ اَرٰ‌ى فِي الْمَنَامِ اَنِّـيٓ اَذْبَـحُكَ فَانْظُرْ‌ مَاذَا تَرٰى ۚ قَالَ يَآ اَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُۖ سَتَجِدُنِـيْٓ اِنْ شَآءَ اللهُ مِنَ الصَّابِرِ‌يْنَ ◌ فَلَمَّآ اَسْلَمَا وَتَلَّهٗ لِلْجَبِيْنِ ◌ وَنَادَيْنَاهُ اَنْ يَّآ اِبْرَ‌اهِيْمُ ◌ قَدْ صَدَّقْتَ الرُّ‌ؤْيَا ۚ اِنَّا كَذٰلِكَ نَـجْزِي الْمُحْسِنِيْنَ ◌ اِنَّ هٰـذَا لَـهُوَ الْبَلَاءُ الْمُبِيْنُ ◌ وَفَدَيْنَاهُ بِذِبْحٍ عَظِيْمٍ ◌ وَتَرَ‌كْنَا عَلَيْهِ فِي الْاٰخِرِ‌يْنَ ◌ سَلَامٌ عَلٰىٓ اِبْرَ‌اهِيْمَ ◌ كَذٰلِكَ نَـجْزِي الْمُحْسِنِيْنَ ◌ اِنَّهٗ مِنْ عِبَادِنَا الْمُؤْمِنِيْنَ ◌

অর্থ : “অতঃপর তিনি (হযরত যবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম) যখন উনার সম্মানিত পিতা হযরত খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার সাথে চলাফিরা করার বয়স মুবারক-এ পৌঁছলেন, তখন হযরত খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, হে আমার সম্মানিত আওলাদ! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি আপনাকে যবেহ করছি, এখন বলুন, আপনার অভিমত কী? হযরত যবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, ‘হে আমার সম্মানিত পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তাই করুন, মহান আল্লাহ পাক উনার ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীলই পাবেন। দু‘জনেই যখন আনুগত্যে মাথা নুইয়ে দিলেন আর হযরত খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনি হযরত যবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনাকে কাত করে শুইয়ে দিলেন। তখন আমি উনাকে জানিয়ে দিলাম, ‘হে খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম! স্বপ্নে দেয়া আদেশ মুবারক আপনি সত্যে পরিণত করেছেন। এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি। অবশ্যই এটা ছিল একটি সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি এক মহান কুরবানী উনার বিনিময়ে আপনার আওলাদ উনাকে ছাড়িয়ে নিলাম। আর আমি উনাকে পরবর্তীদের মাঝে স্মরণীয় করে রাখলাম। হযরত খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক! সৎকর্মশীলদেরকে আমি এভাবেই প্রতিদান দিয়ে থাকি। তিনি ছিলেন আমার মু’মিন বান্দা উনাদের অন্তর্ভুক্ত।” (পবিত্র সূরা আছ-ছফফাত শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ১০০-১১১)

এই সম্পর্কিত আরো পোস্ট সমূহ



হযরত হাবীল আলাইহিস সালাম উনার ও কাবীলের কুরবানী

পৃথিবীর প্রথম কুরবানী সংঘটিত হয় হযরত আবুল বাশার ছফিউল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার যমীনে অবস্থানকালীন সময় থেকেই। হযরত আবুল বাশার ছফিউল্লাহ আলাইহিস সালাম ও উম্মুল বাশার

বিস্তারিত পড়ুন

হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম তিনিই যবীহুল্লাহ

‘তাফসীরে মাযহারী’ উনার মধ্যে উল্লেখ আছে, “এ কথা সুনিশ্চিত যে, ‘পবিত্র সূরা ছফফাত শরীফ’ উনার ১০১নং আয়াত শরীফ উনার মধ্যে উদ্ধৃতغلام حليم অর্থাৎ ‘ধৈর্যশীল পুত্র’

বিস্তারিত পড়ুন